ChannelPadma Privacy Policy

নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে পার পেলেন বোয়ালমারীর ইউএনও

নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে পার পেলেন বোয়ালমারীর ইউএনও
CHANNEL PADMA bd 2022

নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে পার পেলেন বোয়ালমারীর ইউএনও :

আদালতের নোটিশ জারিকারকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও হুমকি দেওয়ার ঘটনায় ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার ইউএনও মো. রেজাউল করিমকে ভবিষ্যতের জন্য সতর্ক করে আদালত অবমাননার অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দিয়েছেন হাইকোর্ট।

আদালত তাকে আরও দায়িত্বশীল ও আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে বলেছেন। একইসঙ্গে একই ঘটনায় নাজির উকিল মিয়াকেও ক্ষমা করে দিয়েছেন আদালত। তাকে আরও সতর্ক হয়ে দায়িত্ব পালন করতে বলেছেন।

সোমবার (২৫ জুলাই) এ বিষয়ে জারি করা রুল নিষ্পত্তি করে বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি রাজিক আল জলিলের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেন।

আদালতে ইউএনও মো. রেজাউল করিমের পক্ষে ছিলেন ব্যারিস্টার মাহবুব শফিক, নাজির উকিল মিয়ার পক্ষে ছিলেন ব্যারিস্টার মোজাম্মেল হক।

গত ২১ জুন আদালতের নোটিশ জারিকারকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে বিচারের হুমকি দেওয়ার ঘটনায় ইউএনও মো. রেজাউল করিমকে ভৎসনা করেন হাইকোর্ট।

আদালত বলেন, আপনি একটি পক্ষ নিয়ে যে আচরণ করেছেন তা সভ্য রাষ্ট্রের জন্য একটি কলঙ্কজনক অধ্যায় হয়ে থাকবে। বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি রাজিক আল জলিলের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ মন্তব্য করেন।

শুনানির শুরুতে আদালতের নোটিশ জারিকারকের সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে বিচারের হুমকি দেওয়ার ঘটনায় ইউএনও মো. রেজাউল করিম ও নাজির উকিল মিয়া নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করেন।

আদালত বলেন, আদালত সবার ওপরে। আপনাকে ক্ষমা করলে আমরা আটকে যাব। আদালতের আদেশ সবার মানতে হয়। আপনি আদালতের আদেশ মানেননি। আদালতের সমন নিয়ে নোটিশ জারিকারকরা আপনাদের কাছে গিয়েছিল।

আপনার উচিত ছিল তাকে ধন্যবাদ দেওয়া। অথচ কী দুর্ব্যবহার না করলেন! কত অজুহাত দেখালেন! আপনি যে আচরণ করলেন তা সভ্য রাষ্ট্রে কলঙ্ক লেগে গেল। আপনি একটা ছোট বিষয় হ্যান্ডেল করতে পারেন না। কীভাবে জনসেবা করবেন?

মনে রাখবেন আইন আদালত আছে বলেই সম্মান পান আপনি। যদি আইন না মানেন আপনাকে কেউ মানবে না।

হাইকোর্ট ইউএনও রেজাউল করিমকে উদ্দেশ করে আরও বলেন, আপনি নিজের ভবিষ্যৎ নিজে নষ্ট করেছেন। আদালত অবমাননার ঘটনায় আদালতে আসতে হয়েছে আপনাকে। আপনার ক্যারিয়ারে একটি স্পট পড়ে গেল।

আমরা যদি একটি লাইন লেখে দিই আপনার ক্যারিয়ার ধ্বংস হয়ে যাবে।

নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে পার পেলেন বোয়ালমারীর ইউএনও

আদালত বলেন, আদালতের জারিকারকের সঙ্গে আপনাদের দুর্ব্যবহারের ঘটনা পত্রিকায় এসেছে। সাধারণ মানুষ কী ভাবছে জানেন? মানুষ ভাবছে বিচার বিভাগ আর নির্বাহী বিভাগের মধ্যে মারামারি লেগে গেছে।

এটা শোভনীয় নয়। বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগের মধ্যে সুসম্পর্ক থাকতে হবে।

আদালত নাজির উকিল মিয়াকে উদ্দেশ করে বলেন, আপনি মূল অপরাধী। আপনি সিনক্রিয়েট করেছেন। খুব খারাপভাবে মিসগাইড করেছেন।

আদালত ইউএনওর আইনজীবী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদকে উদ্দেশ করে বলেন, আপনি আইনমন্ত্রী ছিলেন। একজন সম্মানিত ব্যক্তি। দুর্ভাগ্যবশত আজ এই মামলায় আপনি এসেছেন।

শুনানির শেষ পর্যায়ে আদালত ইউএনওকে আবার ডায়াসের সামনে আসতে বলেন। তাকে বলেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের আচরণ করবেন না। দায়িত্ব-কর্তব্যের দিকে নজর রাখবেন। আদালতকে সম্মান না করলে কখনও আপনিও সম্মান পাবেন না।

আদালত মো. রেজাউল করিম ও নাজির উকিল মিয়াকে ব্যক্তিগত হাজিরা থেকে অব্যাহতি দেন। একইসঙ্গে আগামী রোববার দিন ধার্য করেন তাদের বিরুদ্ধে জারি করা আদালত অবমাননার রুলের আদেশের জন্য।

ইউএনও-নাজির এর পক্ষে আদালতে ছিলেন ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ ও ব্যারিস্টার মাহবুব শফিক। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন তুষার কান্তি রায়, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল।

গত ৭ জুন আদালতের নোটিশ জারিকারকের সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে বিচারের হুমকি দেওয়ার অভিযোগে বোয়ালমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম ও নাজির উকিল মিয়াকে তলব করেন হাইকোর্ট।

বিচারপতি জেবিএম হাসান ও বিচারপতি রাজিক আল জলিলের হাইকোর্ট বেঞ্চ স্বপ্রণোদিত হয়ে এ আদেশ দেন। একইসঙ্গে তাদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগে কেন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না, তা জানতে চেয়েও আদালত রুল জারি করেন।

ওই দিন আদালতে অ্যাটর্নি জেনারেল এএম আমিন উদ্দিন ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল তুষার কান্তি রায় উপস্থিত ছিলেন।

অ্যাটর্নি জেনারেলের উদ্দেশে হাইকোর্ট বলেছিলেন, ইউএনও উপজেলা প্রশাসনের প্রধান কর্মকর্তা। আদালতের আদেশ পালনের জন্যই নোটিশ জারিকারক তার কার্যালয়ে গিয়েছেন। নোটিশ রিসিভ করা স্বাভাবিকভাবেই দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের।

কিন্তু নোটিশ জারিকারকের সঙ্গে যে ধরনের ব্যবহার করা হয়েছে তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। আবার ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে বিচারের হুমকি দিয়েছে। যা খুবই দুর্ভাগ্যজনক।

এর জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল আদালতকে বলেছিলেন, আমি এ বিষয়ে খোঁজ নেব। প্রকৃত ঘটনা কী জানার চেষ্টা করব।

ঘটনার বিবরণে জানা যায়, নির্বাহী প্রকৌশলী, সওজ’ বনাম ছরোয়ার শেখ মামলাটি ফরিদপুরের বোয়ালমারী সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে বিচারাধীন।

এ মামলার নোটিশ জারির জন্য গত ২৭ এপ্রিল দুপুর আড়াইটার দিকে ফরিদপুর জেলা জজ আদালতের নেজারত শাখার জারিকারক কামাল হোসেন ও মেহেদী হাসান বোয়ালমারী উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়ে যান।

ওই কার্যালয়ের নাজির উকিল মিয়াকে নোটিশ গ্রহণের অনুরোধ করেন তারা।

কিন্তু নোটিশ গ্রহণ না করে ব্যস্ততার অজুহাত দেখিয়ে অপেক্ষায় রাখেন। বিকেল ৪টায় পুনরায় নাজিরের কাছে গেলে তাদেরকে ওপর তলায় গিয়ে বসতে বলেন।

এ সময় নোটিশ জারিকারকরা বলেন, তাদের অন্যত্র নোটিশ জারি করতে হবে। তখন উকিল মিয়া বলেন, তাতে তার কী, নোটিশ না রাখলে তার কী হবে? তিনি এর চেয়ে বড় কাজে ব্যস্ত আছেন।

তিনি নোটিশটি পাশের টেবিলে দিতে বলেন। কিন্তু পাশের টেবিলের দায়িত্বরত কর্মচারী নোটিশ বুঝে নিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। এ সময় জারিকারক মেহেদী হাসান নোটিশ জারি না করে চলে আসার জন্য কামাল হোসেনকে বলেন। এছাড়া বিষয়টি কোর্টকে অবহিত করবেন মর্মে বলেন।

তখন উকিল মিয়া বলেন, জজের ভয় দেখিয়ে লাভ নেই। আমরা নির্বাহী বিভাগের লোক। নোটিশ না রাখলে আমাদের কিছু হবে না।

তখন জারিকারক মেহেদী হাসান ঘটনাস্থল ত্যাগ করার জন্য পুনরায় কামাল হোসেনকে বললে ওই সময় নাজির উকিল মিয়া নোটিশ বুঝে নেন।

ইতোমধ্যে উক্ত অফিসের একজন কর্মচারী বিষয়টি ইউএনওকে অবহিত করলে তিনি জারিকারকদের তার কক্ষে ডেকে নিয়ে দরজা আটকে জেরা করতে থাকেন।

একইসঙ্গে ইউএনও অফিসের স্টাফদের সঙ্গে বাজে ব্যবহারের অভিযোগ তুলে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে তাদের সাজা প্রদানের হুমকি দেন ইউএনও।

ইউএনও এ সময় তাদের উভয়ের মোবাইল ফোন জোরপূর্বক কেড়ে নেন এবং মুচলেকা দিয়ে চলে যেতে বলেন। তাদের এনআইডি কার্ডের নম্বর চান ও কার্ড জমা দিতে বলেন।

পরে সন্ধ্যা ৬টার দিকে জারিকারকদ্বয় রোজা রেখেছেন বললে ইউএনও তাদের জানান, মুচলেকা ব্যতীত তিনি তাদের ছাড়বেন না। তিনি তাদের পা ধরে মাপ চাইতে বাধ্য করেন এবং জোরপূর্বক তার নির্দেশনা মতে মুচলেকা লিখে ছেড়ে দেন।

পরে এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ সংশ্লিষ্ট জেলার বিচার প্রশাসনকে লিখিতভাবে জানান জারিকারকদ্বয়।

এ অভিযোগের অনুলিপি আইন ও বিচার বিভাগের সচিব ও সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্টার জেনারেল বরাবর পাঠান ফরিদপুরের সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ মো. আকবর আলী শেখ।

এরপর বিষয়টি হাইকোর্টের নজরে আসলে আদালত স্বপ্রণোদিত হয়ে এ আদেশ দেন।

নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে পার পেলেন বোয়ালমারীর ইউএনও

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.