ChannelPadma Privacy Policy

পদ্মা সেতু : বদলে যাবে কৃষি অর্থনীতি

পদ্মা সেতু : বদলে যাবে কৃষি অর্থনীতি
CHANNEL PADMA bd 2022

স্বপ্নের পদ্মা সেতুর প্রভাবে বদলে যাবে ফরিদপুরের কৃষি অর্থনীতি। বিশেষ করে ফরিদপুরের সালথা ও নগরকান্দা উপজেলার পেঁয়াজ চাষিরা লাভবান হবেন সরাসরি। এছাড়া সদরপুরের লালমি ও সবজি চাষীরা এবং মধুখালীর মরিচ চাষীরাও লাভবান হবেন। বদলে যাবে কৃষি অর্থনীতি

সারা দেশের মধ্যে ফরিদপুর জেলা পেঁয়াজ উৎপাদনে রয়েছে প্রথম সারির দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে। আর জেলার নয়টি উপজেলার মধ্যে শুধু সালথা ও নগরকান্দা উপজেলাতেই যে পেঁয়াজ উৎপন্ন হয় তা বাকি ৭ উপজেলার সমান। যে কারণে এ দুটি উপজেলাকে জেলার পেঁয়াজের রাজধানী বলেন সবাই।

পেঁয়াজের মৌসুমে সালথা ও নগরকান্দা বিভিন্ন ইউনিয়নের হাট বাজার ছয়লাব থাকে পেঁয়াজে। কৃষাণ-কৃষাণী থেকে শুরু করে বর্গাচাষী এবং ছোট বড় পেঁয়াজ ব্যবসায়ী সবাই এই দামি সবজি ফসল নিয়ে হয়ে পড়েন ব্যস্ত। তবে পচনশীল এই সবজিটি বাধ্য হয়েই অনেক সময় কম দামে বিক্রি করে দিতে হতো প্রান্তিক চাষীদের, যেটা আগামী মৌসুমে থেকে আর করতে হবে না। তাদের স্বপ্নের পদ্মা সেতু দিয়ে যানজট আর ভোগান্তি ছাড়াই রাজধানীসহ সংলগ্ন বিভিন্ন জেলাতে অনায়াসে পৌঁছে যেতে পারবে সালথা-নগরকান্দা তথা ফরিদপুর জেলার পেঁয়াজ। বদলে যাবে কৃষি অর্থনীতি

সরেজমিনে সালথার কয়েকটি এলাকা ঘুরে পেঁয়াজ চাষীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, গত দুই বছরে মাঠের কৃষক এক মন পেঁয়াজের দাম পেয়েছে ৯শ থেকে ১ হাজার টাকা, সর্বোচ্চ ১১শ টাকা পেয়েছে খুব ভালো মানের পেঁয়াজ হলে।

দুই ধরনের পেঁয়াজ চাষ হয় ফরিদপুরে। বেশিরভাগই হালি পেঁয়াজ। আর কিছু চাষ হয় মুড়িকাটা জাতের। এই পেয়াজ একেবারেই সংরক্ষণ যোগ্য নয়। দ্রুত পচনশীল এই পেঁয়াজ গৃহস্থরা তাই কম দামে হাটে বাজারে বিক্রি করে দিতেন পঁচে যাওয়ার ভয়ে। অনেক সময় তাদের খরচের পয়সাও উঠতো না। হালি জাতের পেঁয়াজও বৃষ্টির পানি পেলে বা শুষ্ক স্থানে সংরক্ষণ করা না গেলে পঁচে নষ্ট হয়। ফলে যাদের সংরক্ষণের জায়গা নেই তারা বাধ্য হয়েই কম লাভে অথবা উৎপাদন মূল্যে মাঝারি ব্যবসায়ীদের কাছে পেঁয়াজ বিক্রি করে দিতেন। বদলে যাবে কৃষি অর্থনীতি

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা মনে করেন, পদ্মা সেতুতে এই অঞ্চলের পেঁয়াজ রাজধানীতে চলে যাবে দু’ঘন্টার মধ্যেই। ফলে কেউ আর কম দামে পেঁয়াজ বাজারে ছেড়ে দেবে না বা পচে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কাও থাকবে না। এতে মন প্রতি ৫০ টাকা পর্যন্ত বেশি পাবে প্রান্তিক কৃষক, বদলে যাবে পেঁয়াজ চাষীদের চেহারা, তাদের মুখে ফুটবে হাসি এবং আরো বেশি চাষী ফরিদপুর অঞ্চলের পেঁয়াজ আবাদে উৎসাহী হবে।

সালথা উপজেলার গট্টি ইউনিয়নের জয়ঝাপ গ্রামের আবু নাসের জানান, বর্তমানে পেঁয়াজ চাষীদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে রাজধানীতে এটা পৌঁছানো। মাওয়া কিংবা পাটুরিয়া ঘাটে দিনের পর দিন ট্রাক জ্যামে আটকে থাকে। ফলে কস্টিং বেড়ে যায়। আর পঁচার ভয় তো থাকেই। দেখা যায় অনেক সময় যে খরচ হয় পথে, পরে তা বিক্রি করে খরচের পয়সাও উঠে না। পদ্মা সেতু চালু হলে এই পথে যে টাকাটা অতিরিক্ত খরচ হয়, সে টাকাটা যাবে কৃষকের পকেটে

সালথার রামকান্তপুর এলাকার পেঁয়াজ ব্যবসায়ী সুনীল দাস মনে করেন, পদ্মা সেতু দিয়ে পেঁয়াজ ঢাকা সহ দেশের অন্যান্য মোকামে দ্রুত পৌঁছে যেতে পারবে। তাতে করে ফরিদপুরের ছোট-বড় সব পেঁয়াজ ব্যবসায়ীই লাভবান হবে দুইভাবে। প্রথমত : ট্রাকে জ্যামে ফেরিঘাটে আটকে থেকে পচার ভয় থাকবে না, দ্বিতীয়ত: ৩/৪ দিন ট্রাকে করে ঢাকায় পৌঁছানোর যে ঝামেলা তা থাকবে না। ব্যবসায় গতি আসবে, বাড়বে লেনদেন। তবে কৃষককে লাভবান করতে হলে পেঁয়াজের দাম মণপ্রতি ১২শ ৫০ টাকা থেকে ১৩শ টাকা করার দাবি জানান তিনি।

একই দাবি নগরকান্দার ঈশ্বর্দী গ্রামের আবদুল মান্নান মোল্লার। তিনি বলেন, এবছর পাঁচ বিঘা জমিতে পেঁয়াজ আবাদ করে পৌনে ৩শ মন পেয়েছেন তিনি। বর্তমানে বাজার দর মন প্রতি হাজার টাকা। এতে কৃষকের খরচের পয়সাও উঠে না। তিনি বলেন, পদ্মা সেতু হলে মধ্যস্বত্বভোগীরা বেশি সুবিধা করতে পারবে না। বাজারে দাম বেশি থাকলে তার ভাগ কৃষকের পকেটেও ঢুকবে, কেউ জিম্মি করে কম দামে কৃষকের পেঁয়াজ কিনতে পারবে না।

পেঁয়াজের গত পাঁচ বছরের আবাদ ও উৎপাদন নিয়ে কথা হয় জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা ওমর ফারুকের সাথে। এক পরিসংখ্যানে তিনি জানান, গত পাঁচ বছরে ফরিদপুরে পেঁয়াজের আবাদ ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে জেলায় ৩৪ হাজার ১২০ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছিল ৪ লক্ষ ৯ হাজার ৪৪০ মেট্রিক টন। ২০১৯-২০ অর্থবছরে তা বেড়ে উৎপাদিত হয় ৫ লক্ষ মেট্রিক টন। চলতি বছর জেলায় ৪০ হাজার হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ ফলেছে সাড়ে ৫ লক্ষ মেট্রিক টন।

এদিকে ফরিদপুর মরিচ চাষের জন্যও বিখ্যাত। জেলার মধুখালী উপজেলাতে মরিচের ব্যাপক আবাদ করে থাকেন চাষীরা। মধুখালীর মরিচ দেশের গন্ডি পেড়িয়ে বিদেশেও রপ্তানী করা হয়। এলাকার মরিচের ঝাল বেশি হওয়ায় প্রচুর পরিমানে রয়েছে চাহিদা।

মধুখালী উপজেলার কাটাখালী গ্রামের বাসিন্দা মরিচ চাষী আব্দুস সাত্তার শেখ বলেন, আমাদের এলাকায় মরিচের আবাদ বেশি হয়ে থাকে। এলাকার প্রায় সকলেই মরিচ আবাদ করে থাকে। সাধারণত আমরা মরিচ মধুখালী আড়তে গিয়ে বিক্রি করে থাকি। আবার অনেকে ঢাকায় নিয়ে যায়। দাম একটু বেশি পেলেও ঢাকায় নেওয়া ঝুকি বেশি। ফেরিঘাটে দীর্ঘ যানজটের কারনে মরিচ পচে যায়। তাই আমরা ঝুকি না নিয়ে এলাকার আড়তে বিক্রি করে থকি।

তিনি বলেন, পদ্মা সেতু হওয়ায় আমাদের লাভবান হওয়ার সুযোগ বেড়ে গেলো। এখন মূহুর্তের মধ্যেই ট্রাকে করে মরিচ নিয়ে সেতু পার হয়ে ঢাকায় নিয়ে যেতে পারবো। মরিচ আর নষ্ট হবে না।

মধুখালী মরিচ বাজারের আড়তদার আশরাফ হোসেন বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ব্যবসায়ীরা মরিচ কিনতে মধুখালী আড়তে আসে। তাদের একটাই সমস্যা ছিল নদী পারাপার। মরিচ কিনে নিয়ে গিয়ে ঘাটে বসে থাকতে হয়েছে ২/৩ দিন। মরিচ নষ্ট হয়ে গেছে, অনেক ব্যবসায়ী নি:স্ব হয়ে গেছে। এখন আর এসমস্যা হবেনা। অনেক ব্যবসায়ী আমাকে ফোন দিয়ে বলেছে, ভাই পদ্মা সেতু চালু হচ্ছে এখন ভালোভাবে ব্যবসা করতে পারবো।

আরেক চাষী সাইফুল ইসলাম বলেন, মরিচের পাশাপাশি মিষ্টি কুমড়ার আবাদও হয়ে থাকে এ এলাকায়। এখন আমরা সরাসরি মিষ্টি কুমড়া ঢাকায় নিয়ে যেতে পারবো। লাভবান হবে এ অঞ্চলের চাষীরা। বদলে যাবে কৃষি অর্থনীতি

জেলার সদরপুর উপজেলায় বাঙ্গি ও বিভিন্ন সবজির আবাদ হয়ে থাকে। বিশেষ করে পবিত্র রমজান’কে সামনে রেখে প্রতিবছর উপজেলা জুড়ে বাঙ্গি ও লালমির চাষ করে থাকে চাষীরা। এসব বাঙ্গি স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে রাজধানী ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন শহর ও হাট-বাজারে রপ্তানি করা হয়। বদলে যাবে কৃষি অর্থনীতি

কাটাখালী বাজারের বাঙ্গি ব্যবসায়ী শেখ সামাদ জানান, স্থানীয় চাহিদা পূরন করে দেশের বিভিন্ন স্থানে বাঙ্গি যায় এই বাজার থেকে। এখানে পাইকারী ব্যবসায়ীরা এসে বাঙ্গি কিনে নিয়ে যায়। নদী পারাপারের কারনে ব্যবসায় অনেক ক্ষতি হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, ঘাটের যানজটের কারনে আটকে থাকতে হয়, বাঙ্গি পচে নষ্ট হয়ে যায়। বাঙ্গি ট্রাকে করে নিয়ে যাওয়ার সময় অনেক সময় দুই তিন দিনও ঘাটে অপেক্ষা করতে হয়। কিছু বাঙ্গি পচে যায়, আবার বাজার দরও অনেক সময় পড়ে যায়। তাই পদ্মা সেতু দিয়ে এবার পারাপার হবো, দ্রুত রাজধানীতে পৌছাতে পারবো। আবার পরিবহন খরচও কমে যাবে।

সদরপুরের শৈলডুবি এলাকার চাষী আমজাদ হোসেন বলেন, আমাদের এখানে বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষাবাদ হয়ে থাকে। বেগুন, সিম, লাউ বেশি আবাদ করা হয়। এই সবজি দেশের বিভিন্ন স্থানে যায়। মধ্যসত্বভোগীরা লাভবান হয়ে থাকে। আমরা রাজধানীতে বিভিন্ন ঝক্কি ঝামেলার কারনে সবজি নিয়ে যেতে পারিনা। বিশেষ করে ফেরিতে নদী পারাপারের কারনে। এখন পদ্মা সেতু দিয়ে আমরা সবজি রাজধানীতে নিয়ে যেতে পারবো। বদলে যাবে কৃষি অর্থনীতি

তিনি আরো বলেন, আমরা এখন সরাসরি ঢাকায় নিয়ে সবজি বিক্রি করতে পারবো, লাভবানও হতে পারবো। আবার সময়ও বেঁচে যাবে।

সদরপুর উপজেলা কৃষি অফিসার বিধান রায় জানান, এবার রোজার মৌসুমে উপজেলায় ৮শ ৯১ হেক্টর জমিতে বাঙ্গি ও লালমি চাষ করা হয়েছে। গত বছরের তুলনায় এবছর দাম ভালো পাওয়ায় লাভবান হয়েছে চাষীরা। এখন পদ্মা সেতু দিয়ে মালামাল রাজধানীতে নিয়ে যেতে পারবে চাষীরা, এতে আরো বেশি লাভবান হবে তারা।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ফরিদপুরের উপ-পরিচালক ড. হযরত আলী বলেন, পেঁয়াজের জন্য বিখ্যাত এই অঞ্চল। এখানকার চাষীরা পেঁয়াজ, পাট, সবজি, মরিচ সহ বিভিন্ন সবজি আবাদ করে থাকে। চাষীদের উতপাদিত পন্য এখানেই বিক্রি করতে হয়। রাজধানীতে নিতে ঝক্কি ঝামেলা পোহাতে হয়, সেকারনে তারা এলাকাতেই পন্য বিক্রি করে। পদ্মা সেতুর কারনে লাভবান হবে এই অঞ্চলের চাষীরা। এ অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতির সমৃদ্ধি আনবে পদ্মা সেতু। বদলে যাবে কৃষি অর্থনীতি

তিনি আরো বলেন, এখন সরাসরি ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে খুব সহজেই পন্য নিয়ে যেতে পারবে চাষীরা। পরিবহন খরচও আগের চেয়ে কম হবে, সময়ও বাঁচবে। এ অঞ্চলের কৃষকদের ভাগ্য বদলে যাবে পদ্মা সেতুতে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.