ChannelPadma Privacy Policy

প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘরে বদলে যাচ্ছে জামিলা-জরিনাদের জীবন

প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘরে বদলে যাচ্ছে জামিলা-জরিনাদের জীবন
CHANNEL PADMA bd 2022

প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘরে বদলে যাচ্ছে জামিলা-জরিনাদের জীবন

জামিলা বেগম। স্বামী তাকে ছেড়ে চলে গেছেন দীর্ঘদিন আগে। বাসাবাড়িতে কাজ করে কোনরকমে জীবীকা নির্বাহ করতেন, থাকতেন অন্যের বাড়িতে। আশ্রিত জীবন কেটেছে বৃষ্টিতে ভিজে, রোদে পুড়ে।

প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘরে বদলে যাচ্ছে জামিলা-জরিনাদের জীবন : দীর্ঘ এই পথচলায় তার দিকে কেউ তাকায়নি। তিনিও কখনও ‘নিজের একটি ঘরের’ স্বপ্ন দেখেননি। মুজিববর্ষ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপহারের নতুন ঘর পেয়েছেন তিনি। দুই শতক জমির মালিকও হয়েছেন জামিলা বেগম।

মাথা গোজার ঠাই পেয়ে মুখে ফুটেছে হাসি, ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার কাইচাইল ইউনিয়নে সেই ঘরে এখন বসবাস করছেন জামিলা বেগম। পাশাপাশি ঘরের সামনেই পিঠার দোকান দিয়েছেন তিনি। প্রতিদিন যা রোজগার হয় তা দিয়ে ভালোভাবেই চলে যাচ্ছে জামিলা বেগমের।

জামিলা বেগমই নয়, ছবিরন নেছা, সাথী সরকার, জরিনা বেগম সহ হাজারো অসহায় মানুষ নীড় পেয়ে তাদের মুখে হাসি ফুটেছে। মাথা গোজার ঠাই পেয়ে সংসারে অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা আনতে কেউ পিঠা বিক্রি করছেন, কেউবা দর্জির কাজ করছেন, মুদি দোকান দিয়েছেন, আবার কেউ শাক-শবজি চাষ করছেন, কেউবা হাস মুরগী পালন করছেন।

প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘর পাওয়া জামিলা বেগম বলেন, খুব কষ্টে দিনপাত করছিলাম। প্রধানমন্ত্রীর উপহার হিসেবে ঘর পেয়েছি, ঘরের সামনেই পিঠার দোকান দিয়েছি। প্রতিদিন  ২শ থেকে ৩শ টাকা রোজগার হয়, তা দিয়ে ভালোভাবেই চলে যাচ্ছে আমার।

ঘর পাওয়া জরিনা বেগম বলেন, ঘর পেয়ে অনেক খুশি। ওই ঘরেই একটি সেলাই মেশিন দিয়ে আমি দর্জির কাজ করি। প্রতিদিন ৩শ টাকা আয় হয়। স্বামী রাজমিস্ত্রিও কাজ করে। দুইজনের রোজগার দিয়ে খুব ভালো আছি।

ভাঙ্গায় ঘর পাওয়া আসমা বেগম বলেন, ঘরে খুব শান্তিতে বসবাস করছি। এবার ঘরের চালের উপর লাউ গাছ লাগিয়ে ১৫শ টাকা রোজগার হয়েছে। এছাড়া সিম, বেগুন সহ নানা শবজির চাষ করেছি। পাশাপাশি হাস মুরগিও পালন করছি।

আসমানীরে দেখতে যদি তোমরা সবে চাও, রহিমুদ্দির ছোট্ট বাড়ী রসুলপুরে যাও, বাড়িতো নয় পাখির বাসা ভেন্না পাতার ছানি, একটু খানি বৃষ্টি হলেই গড়িয়ে পড়ে পানি…

পল্লী কবি জসীমউদ্দিন তার আসমানী কবিতায় এভাবেই ফরিদপুরের হতদরিদ্র জনগোষ্ঠির জীবনযাত্রা তুলে ধরেছিলেন ৬৭ বছর আগে। সময়ের সাথে অনেক কিছু বদলালেও আসমানীদের চিত্র এ যাবৎকাল রয়ে গিয়েছিল এভাবেই।

এখন সময় বদলেছে-পরিবর্তন হয়েছে আসমানীদের জীবনের, ভেন্না পাতার ছাউনি থেকে তারা এখন বসবাস করছে রঙ্গিন টিন আর পাকা দেয়ালের আধা পাকা বাড়িতে। সেই বাড়িতেই শাক শবজি চাষাবাদ, হাস মুরগি পালন, দর্জির কাজ করে সংসারে এনেছেন অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা।

মুজিববর্ষ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপহার হিসেবে ফরিদপুর জেলার ৯টি উপজেলায় প্রায় চার হাজার অসহায় পরিবার পেয়েছেন মাথা গোজার ঠাই। যারা বসবাস করতেন অন্যের জায়গায় বা ভাসমান অবস্থায়। নীড় পেয়ে বদলে গেছে তাদের জীবনযাত্রা।

জেলার আলফাডাঙ্গা উপজেলার গোপালপুর ইউনিয়নের চরকাতলাসুর গ্রামে ৫৩ একর জমির ওপর নগরের সব সুবিধা নিয়ে ‘স্বপ্ননগর’ নামের বিশেষ একটি আবাসন এলাকা নির্মান করা হয়েছে।

যাদের জমি নেই, ঘর নেই এমন ৩শ পরিবারের ঠাঁই মিলেছে স্বপ্ননগরে। আবাসন এলাকায় গৃহ নির্মাণের পাঁশাপাশি তৈরি করা হয়েছে মসজিদ, মন্দির, একটি বিদ্যালয়, হাট, খেলার মাঠ, ঈদগাহ মাঠ, কমিউনিটি ক্লিনিক, শিশুপার্ক, ইকো পার্ক ও সামাজিক বনায়ন। এছাড়াও সকল উপকারভোগীদের জন্য সুপেয় পানির ব্যবস্থাও করা হয়েছে।

সড়কের দু’পাশে সারিবদ্ধ লাল রঙের টিনের সেমিপাকা ঘরগুলো এলাকাকে আরও মহনীয় করে তুলেছে। যেন দৃষ্টি এড়ায়না পথিকদেরও। দুই কক্ষবিশিষ্ট ঘর, সাথে রয়েছে একটি রান্নাঘর, শৌঁচাগার ও স্টোর রুম। ঘরগুলোর চালের উপর ও পাশ দিয়ে শাক-শবজি চাষাবাদের পাশাপাশি শোভাবর্ধণের জন্য ঘরের আঙিনায় লাগিয়েছে ফুল ও ফলের গাছ।

আবাসন এলাকায় গৃহ নির্মাণের পাশাপাশি শিশুদের পড়ালেখার জন্য তৈরি করা হয়েছে স্কুল, বিনোদনের জন্য শিশু পার্ক। স্কুল থাকায় নিয়মিত পড়ালেখা করতে পারছে কোমলমতি শিশুরা।

সরেজমিনে ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলার স্বপ্ননগর, নগরকান্দা ও সদরপুরের শত স্বপ্ননীড় আশ্রয়ণ প্রকল্পে গিয়ে দেখা যায়, সময়ের সাথে এখন বদলেছে ছিন্নমূল মানুষের যাপিত জীবন। কবির ওই ভেন্না পাতার ছাউনী থেকে তারা এখন বসবাস করছে রঙ্গিন টিন আর পাকা দেয়ালের আধাপাকা বাড়িতে। সেই বাড়িতেই করছে শাক-সবজির আবাদ। কেউবা করছে হাঁস মুরগি-ছাগল-গরু পালন।

সন্তানদের পাঠাচ্ছে স্কুলে। বসতির দুশ্চিন্তা ছেড়ে নিশ্চিন্ত মনে কাজ করে এগিয়ে নিচ্ছে সংসার। সংসারে এসেছে অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা। বসবাসের জন্য সরকারের দেওয়া এই সুবিধাটি পেয়ে খুশি আশ্রয়হীন মানুষগুলো।

নদী ভাঙ্গনে নি:শ^ সবেদা বেগম বলেন, নদীতে আমার বসতবাড়ী বিলীন হয়ে যায়। স্বামী সন্তান নিয়ে অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নেই। সরকারিভাবে একটি ঘর পেয়ে আমি অনেক খুশি। মাথা গোজার ঠাই পেয়েছি, এখন শান্তিতে আছি। ওই ঘরের পাশেই শাক শবজি চাষ এবং হাস মুরগি পালন করছি।

ঘর পাওয়া প্রতিবন্দ্বী আশরাফ হোসেন বলেন, আমার একটি পা নেই। ক্রাচে ভর দিয়ে চলতে হয়। অন্যের বাড়িতে স্ত্রী ছেলে মেয়ে নিয়ে বসবাস করতাম। এখন ঘর পেয়েছি, ঘরে থাকছি, ওই ঘরেই একটি মুদি দোকান দিয়েছি, খুব ভালো আছি।

ঘর পাওয়া ছবিরন নেছা বলেন, আমার আগে একটি বিয়ে হয়েছিল। ওই স্বামী আমাকে ছেড়ে দিয়েছে। আমি খুব অসহায় হয়ে পড়েছিলাম। সরকার আমাকে একটি ঘর দিয়েছে, সেখানে বসবাস করছি। ওই ঘরেই দর্জির কাজ করে যা রোজগার হয় তা দিয়ে ভালোই চলছে আমার। এখন আর মানুষের কথা শুনতে হয় না।

আলফাডাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো: রফিকুল হক বলেন, উপজেলার গোপালপুর ইউনিয়নের চরকাতলাসুর গ্রামে ৫৩ একর জমির ওপর নগরের সব সুবিধা নিয়ে ‘স্বপ্ননগর’ নামের বিশেষ একটি আবাসন এলাকা নির্মান করা হয়েছে।

তিনি বলেন, যাদের জমি নেই, ঘর নেই এমন ৩শ পরিবারের ঠাঁই মিলেছে স্বপ্ননগরে। আবাসন এলাকায় গৃহ নির্মাণের পাঁশাপাশি তৈরি করা হয়েছে মসজিদ, মন্দির, একটি বিদ্যালয়, হাট, খেলার মাঠ, ঈদগাহ মাঠ, কমিউনিটি ক্লিনিক, শিশুপার্ক, ইকো পার্ক ও সামাজিক বনায়ন। এছাড়াও সকল উপকারভোগীদের জন্য সুপেয় পানির ব্যবস্থাও করা হয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরো বলেন, দুই কক্ষবিশিষ্ট ঘর, সাথে রয়েছে একটি রান্নাঘর, শৌঁচাগার ও স্টোর রুম। ঘরগুলোর চালের উপর ও পাশ দিয়ে শাক-শবজি চাষাবাদ করে বাসিন্দারা সাবলম্বি হচ্ছে। আবাসন এলাকায় গৃহ নির্মাণের পাশাপাশি শিশুদের পড়ালেখার জন্য তৈরি করা হয়েছে স্কুল, বিনোদনের জন্য শিশু পার্ক। স্কুল থাকায় নিয়মিত পড়ালেখা করতে পারছে কোমলমতি শিশুরা।

সদরপুরে গড়ে তোলা হয়েছে শত স্বপ্ননীড় নামে আরো একটি আবাসন এলাকা। এখানেও দেড় শতাধিক অসহায় পরিবারের ঠাই মিলেছে। এছাড়া ফরিদপুর সদর, মধুখালী, বোয়ালমারী, ভাঙ্গা, নগরকান্দা, সালথা ও চরভদ্রাসনেও ঠাই পেয়েছে অসংখ্য অসহায় পরিবার।

আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দারা গঠন করেছে সমবায় সমিতি; নিয়মিত নিচ্ছে প্রশিক্ষণ; অনেকের একাডেমিক শিক্ষা না থাকলেও নানা প্রশিক্ষণে তারা হয়ে উঠছে স্বশিক্ষিত। জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসনের নিয়মিত তদারকিতে ক্রমেই সময়ের সাথে সাথে উন্নয়নের নানা দিকে এগিয়ে যাচ্ছে আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দারা।

নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জেতী প্রু বলেন, অসহায় মানুষগুলোকে ঘর দেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। ইতিমধ্যেই অনেকেই দর্জির কাজ করে স্বাবলম্বি হয়েছে। নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে, চিকিতসা, শিক্ষার বিষয়ও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। খুব শান্তিতেই বসবাস করছে বাসিন্দারা।

প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘরে বদলে যাচ্ছে জামিলা-জরিনাদের জীবন

আলফাডাঙ্গা উপজেলার গোপালপুর ইউপি চেয়ারম্যান এনামুল হাসান বলেন, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালি স্বাধীনতার মহানায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মুজিববর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে জেলায় হতদরিদ্র যাদের বসবাসের কোন ঠিকানা ছিলো না, তাদের স্থায়ী আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেছে।

এটা সত্যিই বিষ্ময়কর। ওই মানুষগুলো তাদের ভাগ্যের চাকা নতুন ভাবে ঘুরাতে শুরু করেছে। আমার ইউনিয়নে বিশেষ প্রকল্প করায় প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ।

ইউপি চেয়ারম্যান আরো বলেন, আশ্রয় পাওয়াদের অধিকাংশই রাস্তার ধারে ফুটপাত বা কারও আশ্রয়ে বসবাস করতেন। এই আশ্রয়হীন মানুষেরা এখন প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া উপহারের ঘরে বসবাস করছেন। মাথা গোজার ঠাই পেয়ে খুশি অসহায় মানুষগুলো, বদলে যাচ্ছে তাদের জীবনযাত্রার মান।

বোয়ালমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাউল করিম বলেন, আশ্রয়ন প্রকল্পের বাসিন্দারা তাদের জীবন মান উন্নয়নে নিজেরাই এগিয়ে এসেছে, আমরা সরকারের পক্ষ থেকে তাদের সহযোগিতা করছি, এই প্রকল্প বিশে^ একটি রোল মডেল, কারণ এভাবে কোন দেশে আশ্রয়হীনদের জন্য সরকারিভাবে নিরাপদ ছাদ তৈরী করার ব্যবস্থা করা হয়নি।

ফরিদপুর সদর উপজেলার কানাইপুর ইউনিয়নের প্রকল্প পরিদর্শন করেন জেলা প্রশাসক অতুল সরকার। প্রকল্পের বাসিন্দাদের সাথে মতবিনিময় করেন জেলা প্রশাসক।

এসময় প্রকল্পের বাসিন্দারা খুশি হয়ে তাদের চাষাবাদ করা নানা শাক-শবজি জেলা প্রশাসকের হাতে তুলে দেন। জেলা প্রশাসকও শিশুদের হাতে চকলেট ও খাবার সামগ্রী তুলে দেন। প্রকল্পের বাসিন্দাদের নিয়ে নানা পরিকল্পনার কথা জানালেন জেলা প্রশাসক অতুল সরকার।

ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক অতুল সরকার জানান, এই প্রকল্পের মাধ্যমে আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর একটি স্বপ্নের বাস্তবায়ন করেছি। ফরিদপুরে আমরা আশ্রয়ন প্রকল্প সংলগ্ন বেশ কয়েকটি স্থানে শিশুদের খেলার মাঠ, স্কুল, মসজিদ, মাদ্রাসা, মন্দির তৈরি করে দেয়া হয়েছে। এই প্রকল্পের বাসিন্দাদের স্বচ্ছলতা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষন এবং ঋণেরও ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

তিনি আরো জানান, সব মিলেয়ে প্রায় ৫ হাজার ভূমিহীন ও গৃহহীনদের জন্য ভূমি ও গৃহ প্রদান করা হয়েছে। কিছু কাজ চলমান রয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে যোগ্যদের চিহ্নত করে ঘর দেয়া হয়েছে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.