ChannelPadma Privacy Policy

‘সমাজের ন্যায় বিচার নিশ্চিত করবো বিচারক হয়ে’

‘সমাজের ন্যায় বিচার নিশ্চিত করবো বিচারক হয়ে’
CHANNEL PADMA bd 2022

ছোট বেলায় বন্ধুরা বলতো কেউ ডাক্তার হবে, কেউ ইঞ্জিনিয়ার আবার কেউবা পাইলট হবে। কিন্তু আমার স্বপ্ন ছিল আমি আইন বিভাগে পড়ালেখা করে বিচারক হবো বিচারক হয়ে বিচার করব। কথাটি কাউকে বলতে পারতাম না, মনের মাঝে পুশে রেখেছিলাম। আমার পরিবার ও আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে অনেকেই ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার সহ বিভিন্ন পেশায় রয়েছে। একারনে আমার ইচ্ছা ছিল আমি বিচারক হবো। একদিন বাবাও আমাকে বললো আমি চাই তুমি আইন বিভাগে পড়ালেখা করে বিচারক হও। সেদিন থেকেই আমি স্বপ্ন দেখা শুরু করলাম, পাশাপাশি পড়ালেখায় আরো মনোযোগ দিতে লাগলাম।

বিচারক হয়ে ন্যায় বিচার সমাজের জন্য
বিচারক হয়ে ন্যায় বিচার সমাজের জন্য

তখন আমি এসএসসি পরীক্ষা দিবো। ইতিমধ্যেই বিজ্ঞান বিভাগ নিয়ে ফেলেছি। কি করা যাবে, ফরিদপুর জিলা স্কুল থেকে এসএসসি পরীক্ষা দিলাম। জিপিএ-৫ পেয়ে উর্ত্তীর্ণ হই। এরপর বাবার পরামর্শে বিজ্ঞান বিভাগ পরিবর্তন করে মানবিক বিভাগে ২০১৯ সালে উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হই সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ ফরিদপুরের মানবিক শাখায়।

তখন থেকেই স্বপ্ন পূরনের জন্য পড়ালেখার আরো জোর দেই। সেখান থেকে গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়ে মানবিক বিভাগে ঢাকা বোর্ডের সমন্বিত মেধা তালিকায় ২৮তম হয়ে উত্তীর্ণ হই। এরপর বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য ঢাকার ইউসিসিতে কোচিং শুরু করি।

আজ আমার স্বপ্ন পূরনের প্রথম ধাপ পার হতে পেরেছি। এখনো অনেক পথ বাকি। আইন বিভাগ নিয়ে পড়ালেখা করবো। আমার স্বপ্ন বিচারক হয়ে সমাজে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করা।

এভাবেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ‘খ’-ইউনিটে (কলা অনুষদ) ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের স্নাতক প্রথম বর্ষ ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম হওয়া ফরিদপুর সরকারি রাজেন্দ্র কলেজের শিক্ষার্থী নাহানুল কবির নোয়েল (২০) তার স্বপ্নের কথাগুলো বলেন বাংলা ট্রিবিউনের প্রতিবেদকের কাছে।

নোয়েল আরো বলেন, আব্বা-আম্মাই আমার অনুপ্রেরনা। আমার এবং তাদেরও স্বপ্ন আমি বিচারক হই, তাই আব্বা-আম্মার স্বপ্ন পূরন করার চেষ্টা করছি। আমার আব্বা-আম্মা দুজনেই অসহায় মানুষের পাশে দাড়িয়ে তাদের সহযোগিতা করেন, এটা দেখেই আমারও ইচ্ছা আমিও অসহায় মানুষের পাশে দাড়াবো। বিচারক হয়ে ন্যায় বিচার সমাজের জন্য

নোয়েল বলেন, প্রতিদিন ৮-১০ ঘন্টা পড়ালেখা করেছি আমি। একজন ছাত্র গড়ে ৯ঘন্টা পড়ালেখা করলে ভালো রেজাল্ট করা সম্ভব। বাবা-মায়ের পাশাপাশি আমার শিক্ষকদের প্রতিও আমি কৃতজ্ঞ, কারন স্যাররা আমাকে অনেক সহযোগিতা করেছেন। বিশেষ করে ইউসিসির স্যার শরীফ ওবায়দুল্লাহ। আমার এই ভালো ফলাফলে তার অনেক অবদান রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ‘খ’-ইউনিটে (কলা অনুষদ) ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের স্নাতক প্রথম বর্ষ ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম হয়েছেন ফরিদপুর সরকারি রাজেন্দ্র কলেজের শিক্ষার্থী নাহানুল কবির নোয়েল। পরীক্ষায় ১২০ নম্বরের মধ্যে তিনি ৯৬.৫ পেয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইনস্যুরেন্স কেন্দ্রে পরীক্ষা দিয়েছিলেন তিনি।

সোমবার (২৭ জুন) দুপুর ১টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান প্রশাসনিক ভবনের অধ্যাপক আব্দুল মতিন ভার্চুয়াল ক্লাসরুমে আনুষ্ঠানিকভাবে ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল ঘোষণা করেন। বিচারক হয়ে ন্যায় বিচার সমাজের জন্য করতে হবে

নাহানুল কবির নোয়েল ময়মনসিংহ সদরের ভাবোখালী ইউনিয়নের ঘাগড়া গ্রামের বাসিন্দা চাঁদপুর সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ ইঞ্জিনিয়ার আনোয়ারুল কবিরের একমাত্র সন্তান নোয়েল। মা নাজমুন নাহার মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার মৎস্য সম্প্রসারণ কর্মকর্তা।

২০০২ সালে ময়মনসিংহ শহরের চরপাড়া এলাকায় জন্ম গ্রহণ করেন নোয়েল। এরপর বাবার চাকরির কারণে শিশু থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন খুলনা শহরের একটি স্কুলে।

এরপর ২০১২ সালে নোয়েলের বাবা আনোয়ারুল কবির খুলনা থেকে বদলি হয়ে আসেন ফরিদপুরে। ফরিদপুর সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের উপাধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করেন।

এদিকে ২০১৩ নোয়েলের মা নাজমুন নাহার ফরিদপুর সদর উপজেলা মৎস্য সম্প্রসারণ কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেন। ফরিদপুরেই বাবা-মায়ের সাথে থাকতেন নোয়েল। সেকারনে প্রথমে জিলা স্কুল এবং পরবর্তীতে সরকারি রাজেন্দ্র কলেজে পড়ালেখা করেন তিনি।

এরপর গত ২০১৯ সালের নভেম্বর মাসে নোয়েলের বাবা আনোয়ারুল কবির বরগুনাতে বদলী হয়ে যান। সেখান থেকে গত ৬মাস আগে তিনি বদলী হয়ে চাঁদপুর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করেন, বর্তমানে তিনি সেখানে কর্মরত রয়েছেন।

এদিকে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে নোয়েলের মা নাজমুন নাহার বদলী হয়ে মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার মৎস্য সম্প্রসারণ কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেন। বাবা-মা অন্যত্র বদলী হয়ে গেলেও ফরিদপুরে থেকে পড়ালেখা চালিয়ে যান নোয়েল। ছুটি পেলেই বাবা-মা এসে নোয়েলকে দেখে যেতেন।

নোয়েলের বাবা ইঞ্জিনিয়ার আনোয়ারুল কবির বলেন, ছেলে ভালো রেজাল্ট করায় মনটা ভরে গেছে। নিজেকে ভাগ্যবান মনে হচ্ছে, নিজের ছেলে দেশসেরা হয়েছে। আমার অনেক শিক্ষার্থীই দেশের সেরা রেজাল্ট করেছে, তখন ভাবতাম আমার ছেলেটা যদি এমন রেজাল্ট করতো। আজ আমার ছেলে এবং আমার স্বপ্নপূরন হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, রেজাল্ট ঘোষণার পর বিভিন্ন জায়গা থেকে ফোন পাচ্ছি। ছেলের জন্য আমার গর্ব হচ্ছে। ছেলে আমার তার স্বপ্নপূরন করতে পাওে সেজন্য ছেলের জন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া চাই।

নোয়েলের মা নাজমুন নাহার বলেন, আমার ছেলে ছোটবেলা থেকেই খুবই শান্ত প্রকৃতির। ও তেমন কোনো আবদার করেনা কখনো। পড়ালেখা নিয়েই ব্যস্ত থাকতো সব সময়।

তিনি আরো বলেন, আমাদের পরিবার ও আত্মীয়স্বজনদের অনেকেই ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক রয়েছে। নোয়েল এবং ওর বাবার ইচ্ছা ছিল নোয়েল বিচারক হবে। আইন বিষয় নিয়ে পড়ালেখা করবে। ওর স্বপ্ন পূরন হয়েছে। ওর বাবা ইঞ্জিনিয়ার, আমি কৃষিবিদ তাই আমরা চেয়েছি, আমার ছেলে প্রশাসন বা জুডিশিয়ালে যাক।

নাজমুন নাহার বলেন, আমি এবং ওর বাবা ফরিদপুর থেকে বদলী হয়ে গেলেও নোয়েল ফরিদপুরের বাসায় থেকে যায়। মাঝে মধ্যে ফরিদপুরে গিয়ে ওকে দেখে আসতাম। ভালো রেজাল্ট করায় মনটা ভরে গেছে। আমার ছেলে আইন বিষয় নিয়ে পড়ালেখা করে ভবিষ্যতে একজন বিচারক হয়ে দেশের মানুষের ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করবে এই আশা করি।

নোয়েল উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার পর বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য কোচিং করেছেন ঢাকার ইউসিসি কোচিং সেন্টারে। ইউসিসি কোচিং সেন্টারের শিক্ষক শরীফ ওবায়দুল্লাহ বলেন, নোয়েল অনেক মেধাবী ছাত্র। পড়ালেখা ছাড়া আর কোনো কিছুই তার ভাবনায় নেই। আমিও চেষ্টা করেছি ওর মেধা যাতে কাজে লাগে। একবার পড়িয়ে দিলে দ্বিতীবার আর নোয়েলকে কোনো বিষয় বলা লাগে না। অনেক দূর এগিয়ে যাবে নোয়েল। দোয়া করি নোয়েল যেন ওর স্বপ্ন পূরন করতে পারে। বিচারক হয়ে ন্যায় বিচার সমাজের সকলের জন্য

ফরিদপুর সরকারি রাজেন্দ্র কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর অসীম কুমার সাহা বলেন, আমাদের প্রতিষ্ঠানের একজন শিক্ষার্থী দেশসেরা হয়েছে এটা আমাদের জন্য অত্যন্ত গৌরব এবং আনন্দের। ওর রেজাল্ট শোনার পর নোয়েলের বাবা-মায়ের সাথে কথা বলেছি। নোয়েল যেহেতু ওর মায়ের সাথে ঘিওরে থাকে সেকারনে দেখা করা সম্ভব হয়নি। কলেজের পক্ষ থেকে নোয়েলকে সংবর্ধনা দেওয়ার আয়োজন করবো।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদ সূত্রে জানা গেছে, ‘খ’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় ১ হাজার ৭৮৮টি আসনের বিপরীতে মোট অংশ নেন ৫৬ হাজার ৯৭২ জন শিক্ষার্থী। সেখানে কৃতকার্য হয়েছেন ৫ হাজার ৬২২ জন। পাসের হার ৯.৮৭ শতাংশ। পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েছেন ৯০.১৩ শতাংশ।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.