ChannelPadma Privacy Policy

সন্তানকে ফিরে পেতে রাষ্ট্রদূতের সামনে কাঁদলেন মা

সন্তানকে ফিরে পেতে রাষ্ট্রদূতের সামনে কাঁদলেন মা
CHANNEL PADMA bd 2022

সন্তানকে ফিরে পেতে রাষ্ট্রদূতের সামনে কাঁদলেন মা : শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার দক্ষিন লোনসিং গ্রামের নাছিমা বেগমের ছেলে কামাল মুন্সি (৩০)। অবৈধ পথে ইতালি যাওয়ার জন্য ৩ বছর আগে বাড়ি থেকে বের হন।

২৯ জুনের পর আর তার সন্ধান পাচ্ছেন না পরিবার। ছেলের সন্ধান চেয়ে কাঁদলেন মা নাছিমা আক্তার।

শুক্রবার শরীয়তপুরে অভিবাসন সংক্রান্ত একটি মতবিনিময় সভায় ইতালির রাষ্ট্রদূত এনরিকো নুনজিয়াতা ও পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেনসহ অতিথিদের সামনে ওই মা কান্না করতে করতে তার সন্তানের সন্ধান চান।

নাছিমা আক্তার জানান, শরীয়তপুরের নড়িয়া পৌরসভার দক্ষিন লোনসিং এলাকার মৃত ফজলুল হক মুন্সির চার ছেলে। তাদের মধ্যে মেঝ ছেলে কাসাল মুন্সি গ্রামে কৃষি কাজ করতেন। সংসারের অভাব দুর করতে ইতালি যাওয়ার জন্য স্থানীয় দালাল হানিফ সরদারের মাধ্যমে লিবিয়া যান।

তখন ওই দালালকে সাড়ে ৪ লাখ টাকা দেয় কামালের পরিবার। এর পর লিবিয়ায় অবস্থান করা আরেক বাংলাদেশি দালাল হাসানের সাথে চুক্তি হয় কামালের পরিবারের। তাকে বিভিন্ন সময় দেয়া হয় আরো ১০ লাখ টাকা।

গত ২৯ জুন কামাল বাড়িতে ফোন করে মা নাছিমা বেগম ও স্ত্রী সামিয়া আক্তারের সাথে কথা বলেন। তাদের কাছে জানান ১ জুলাই তাকে নৌযানে করে ভূমধ্য সাগর পারি দিয়ে ইতালির সীমানায় পৌঁছে দেয়া হবে।

২৯ তারিখের পর আর কামালের সাথে যোগাযোগ করতে পারছে না পরিবার। গত ৩ জুলাই লিবিয়ার দালাল হাসান ফোন করে কামালের পরিবারকে জানায় ভূমধ্য সাগর পারি দেয়ার সময় কামাল হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা গেছেন। তার মরদেহ ফেরত পাঠানোর জন্য পরিবারের কাছে টাকা দাবী করা হয়।

সন্তানকে ফিরে পেতে রাষ্ট্রদূতের সামনে কাঁদলেন মা

পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের সহযোগিতায় শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসন মানব পাচার ও নিরাপদ অভিবাসন উৎসাহিত করার লক্ষ্যে মতবিনিময় সভার আয়োজন করে। শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে পৌরসভা মিলনায়তনে সভাটি অনুষ্ঠিত হয়।

এতে সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক পারভেজ হাসান। প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন শরীয়তপুর ৩ আসনের সংসদ সদস্য নাহিম রাজ্জাক, ইতালির রাষ্ট্রদূত এনরিকো নুনজিয়াতা,পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন,

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সচিব আখতার হোসেন, আইজিপি বেনজির আহম্মেদ, প্রবাসী কল্যান ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রনালয়ের সচিব আহমেদ মুনিরুছ ও শরীয়তপুরের পুলিশ সুপার এসএম আশ্রাফুজ্জামান প্রমূখ।

পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন যখন মঞ্চে দাড়িয়ে মতবিনিময় সভায় অংশগ্রহনকারিদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দিচ্ছিলেন তখন নাছিমা বেগম দাড়িয়ে কেঁদে ওঠেন। তিনি কান্না করতে করতে তার ছেলেকে উদ্ধার করে ফিরিয়ে দেয়ার জন্য আকুতি করতে থাকেন।

এমন পরিস্থিতিতে পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন ওই নারীকে আশ্বস্ত করে বলেন, অবৈধ পথে ইতালি যাওয়ার সময় নিখোঁজ কামাল মৃধার সন্ধানে কাজ করবে পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়। তিনি উপস্থিত সকলের প্রতি আহবান জানান অবৈধ পথে বিদেশ না যাওয়ার জন্য জনসচেতনতা তৈরিতে ভূমিকা রাখতে।

ইতালি যাওয়ার পথে নিখোঁজ কামাল মৃধার মা নাছিমা বেগম বলেন, আমরা গরিব নিরীহ মানুষ। জমি-জমা বিক্রি করে সন্তানের উন্নত জীবন গড়তে দালালকে টাকা দিয়েছি। এখন সন্তানেরও খোঁজ পাচ্ছি না। আমার সন্তানকে ফিরে পেতে সকলের সহযোগিতা চাই।

কামালের স্ত্রী সামিয়া আক্তার বলেন, বিয়ের কিছুদিন পরই সে ইতালি যাওয়ার জন্য রওনা হয়। স্বামীর পথ চেয়ে তিন বছর ধরে বসে আছি। ফোনে অনেক বার বলেছিলাম ফিরে আসতে। দালাল চক্র তাকে দেশে ফিরতে দেয়নি। তাকে জিম্মি করে বিভিন্ন সময় টাকা নিয়েছে। এখন তারই মৃত্যু সংবাদ দিয়ে টাকা চাচ্ছে। আমরা এখন কি করব? কিভাবে মানুষটার সন্ধান পাব?

মতবিনিময় সভায় বক্তব্যে ইতালির রাষ্ট্রদূত এনরিকো নুনজিয়াতা বলেন, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিপদজনক পথে ইতালি গমন আমাদের সবার জন্য উদ্বেগজনক। তাই মানবিক কারণে জীবন বাঁচাতে শ্রম অভিবাসিদের প্রতারণা ও নির্যাতন থেকে বাঁচাতে সর্বপরি মানব পাচার দমনে জনসচেতনতা বৃদ্ধি একান্ত প্রয়োজন।

তিনি বলেন, বিপদজন পথে যারা ইতালি যাবার ঝুঁকি নেয়, তারা মানব পাচারের শিকার হয়ে প্রতারণা, হিংস্রতা ও অত্যাচারিত হয়ে অমানবিক অবস্থায় পরে। ভূমধ্যসাগর এবং উত্তর-পশ্চিম আটলান্টিক সাগর পথ পাড়ি দিতে গিয়ে গত বছর ৩ হাজার ২৩১ জন মৃত্যুবরণ করেছেন।

রাষ্ট্রদূত বলেন, শ্রমবাজার গতিশীল করার জন্য বাংলাদেশ ও ইতালী সরকার চুক্তি ভিত্তিক কাজ করছে। এই চুক্তির ফলে বাংলাদেশী শ্রমিকরা কাজের জন্য বৈধ উপায়ে ইতালী যেতে পারবে।

বাংলাদেশীদের জন্য সংরক্ষিত ৩ হাজার কোটা সুবিধা রয়েছে। ভবিষ্যতে এই সংখ্যা আরও বৃদ্ধি করা হবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ইতালীয়ান রাষ্ট্রদুত এনরিকো নুনজিয়াতা।

এনরিকো নুনজিয়াতা আরও বলেন, ২০২০ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ইতালি সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশ ইতালিতে নির্দিষ্ট মৌসুমে এবং অন্যান্য সময়ে কাজ করার কোটা ভিত্তিক সুবিধা লাভ করে। এরপর গত ২ বছরে ১৬০০ শ্রমিক বৈধ উপায়ে ইতালিতে কাজ করার সুযোগ পেয়েছে। বর্তমানে আরও ৩ হাজার বাংলাদেশী বৈধ ভিসা পেতে যাচ্ছে।

এখন থেকে বাংলাদেশীদের জন্য ইতালি যাওয়ার সুযোগ উন্মুক্ত থাকবে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিপজনক পথে বিদেশ গমন সকলের জন্য উদ্বেগজনক উল্লেখ করে তিনি মানব পাচার রোধে জনসেচতনতা বৃদ্ধির উপর জোর দেয়ার তাগিদ দেন।

২০২২ সালে জুন মাস পর্যন্ত বিভিন্ন উপায়ে অবৈধ পথে ২১ হাজার ৮৪৮ অনিয়মিত অধিবাসী ইতালীতে প্রবিশ করে। যা গত বছরের তুলনায় ২২ শতাংশ বেশি। ১৪ হাজার ৭৫৮ জন ভূ-মধ্য সাগর পাড়ি দিয়ে উপরোপে পাড়ি জমায়। যার মধ্যে ইতালীতে প্রবেশ করে ৬ হাজার ৫৫৭ জন এবং গ্রীসে পৌছাঁয় ৫ হাজার ৭০ জন।

যা গত বছরের তুলনায় ১৫৩ শতাংশ বেশি। ২০২২ সালে ইতালী সর্বমোট ২৮ হাজার ৫০৪ জন অনিয়মিত অধিবাসীকে নিবন্ধন করেছে। যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৩১ শতাংশ বেশী। অভিবাসন প্রত্যাশীদের মধ্যে শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত ৪ হাজার ৬০৬ জন বাংলাদেশী অভিবাসন চেয়ে আবেদন করেছে। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে মিশরীয়রা।

বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদ তার বক্তব্যে বলেন, বিদেশ নেওয়ার কথা বলে কোন দালাল যেন কোন সহজ-সরল, নিরীহ মানুষকে প্রলুব্ধ করে মৃত্যু ফাঁদে নিক্ষেপ না করতে পারে সেজন্য সকলের সহযোগীতা চাই।

যারা প্রতারিত হচ্ছে তারা আপনার আমার ভাই, বন্ধু, পরিবারের লোক, তারা আপনার সন্তানও হতে পারে। সকলে এগিয়ে আসুন আমরা হাতে হাত মিলিয়ে এই অঞ্চলে থেকে আমরা এই অনিরাপদ অভিবাসন চিরতরে নির্মূল করি।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.