মঙ্গলবার, ২৪ মে ২০২২, ০৮:৫৮ পূর্বাহ্ন

বীরাঙ্গনার স্বীকৃতির পর মাথা গোজার ঠাঁই পেলেন মায়া রানী

উজ্বল সিকদার, স্টাফ রিপোর্টার
  • আপডেটের সময় : বৃহস্পতিবার, ১৩ মে, ২০২১

বীরাঙ্গনার স্বীকৃতির পর এবার মাথা গোজার ঠাঁই পেলেন অসহায় বীরাঙ্গনা মায়া রানী সাহা (৭০)। ফরিদপুর বর্ধিত পৌরসভার শোভারামপুর এলাকার বাসিন্দা নিঃসন্তান মায়া রানীর বসবাসের কোন ঘর না থাকায় খুব কষ্টে দিনপাত করছিলেন তিনি। মায়া রানীর দুরাবস্থার কথা জানতে পেরে জেলা প্রশাসক অতুল সরকার তাঁর থাকার জন্য একটি ঘর নির্মাণ করে দিচ্ছেন।

শনিবার (০৮ মে) দুপুরে বীরাঙ্গনা মায়া রানী সাহার ঘরের নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করেন সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ মাসুম রেজা। এসময় প্রশাসনের কর্মকর্তাবৃন্দ ও মুক্তিযোদ্ধাবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

জানা যায়, মহান মুক্তিযুদ্ধে নিজ বাড়িতে ১৬ বছর বয়সে হানাদার বাহিনী ও স্থানীয় দোসরদের দ্বারা নির্যাতিত হন মায়া রানী সাহা। ফরিদপুর বর্ধিত পৌরসভার শোভারামপুরের বাসিন্দা মায়া রানী সাহা দীর্ঘদিন ধরে অসহায়ভাবে জীবন যাপন করছিলেন। তার ছিলো না কোন স্বীকৃতি কিংবা ভরসার জায়গা। খবর পেয়ে গণশুনানীর সময় ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক অতুল সরকার এর সাথে সাক্ষাত করেন মায়া রানী। মায়া রানী অশ্রুভারাক্রান্ত কন্ঠে তার সাথে ঘটে যাওয়া সেই বিভীষিকাময় অধ্যায়ের কথা, তার অসহায়ত্বতার কথা জানান জেলা প্রশাসককে।

তাৎক্ষণিকভাবে জেলা প্রশাসক ফরিদপুর সদর উপজেলার নির্বাহী অফিসার মোঃ মাসুম রেজাকে নির্দেশনা প্রদান করেন মায়া রাণী সাহার বিষয়ে সরেজমিনে তদন্ত করতঃ সুস্পষ্ট মতামতসহ জামুকায় প্রতিবেদন প্রেরণের জন্য। সেই নির্দেশনার আলোকে গত বছরের ১৪ জানুয়ারি উপজেলা নির্বাহী অফিসারের নেতৃত্বে উপজেলা বীরাঙ্গনা যাচাই বাছাই সংক্রান্ত গঠিত বিশেষ কমিটি প্রতিবেদন প্রস্তুতকরতঃ জামুকা বরাবর প্রেরণ করেন। তারই প্রেক্ষিতে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে মায়া রাণী সাহাকে ৩৮০ নং গেজেটে বীরাঙ্গনা হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেন।

এদিকে বীরাঙ্গনা হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও তার ছিলনা কোনো থাকার ঘর। মায়া রানী সাহার জরাজীর্ণ আবাসস্থল সেমি পাকা ভবনে রূপান্তরে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নেন জেলা প্রশাসক অতুল সরকার। ফরিদপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে একটি সেমি পাকা ঘর নির্মানের কাজ শুরু হয়েছে মায়া রানী সাহার জরাজীর্ণ বসত ভিটায়।

ফরিদপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ মাসুম রেজা জানান, ফরিদপুরে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত ৫জন বীরাঙ্গনা রয়েছেন। এদের প্রত্যেককে একটি করে ঘর নির্মাণ করে দেবে সরকার। মায়া রানীর থাকার জায়গা না থাকায় একটু আগে ভাগেই আমরা ডিজাইন ঠিক রেখে তাকে একটি ঘর তৈরি করে দিচ্ছি জেলা প্রশাসক স্যারের নির্দেশে।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার আরো জানান, মুজিববর্ষে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুত সকল গৃহহীন ও ভূমিহীনদের জন্য আবাসস্থল নির্মাণ করে দিয়েছে সরকার। তারই ধারাবাহিকতায় জেলা প্রশাসন বীরাঙ্গনা মায়া রানী সাহাকে এই ঘরটি মুজিব বর্ষের উপহার হিসেবে প্রদানের ব্যবস্থা নিয়েছে।

মাসুম রেজা জানান, জেলা প্রশাসক স্যারের নির্দেশনা রয়েছে, জেলার যে সকল বীর মুক্তিযোদ্ধা আবাসস্থলের কষ্টে আছেন, মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে তাদের অনুকুলে ঘর বরাদ্দের পূর্ব পর্যন্ত তারা সম্মত থাকলে তাদেরকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ন প্রকল্পে পুনর্বাসন করতে হবে। আমরা সেই নির্দেশনা মোতাবেক কাজ করে যাচ্ছি।

মাথা গোজার ঠাঁই পেয়ে খুশি বীরাঙ্গনা মায়া রানী সাহা। তিনি জেলা প্রশাসককে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, এমন ভালো মানুষ আর হয় না। তাঁর কারনে আমার নাম তালিকায় উঠেছে। বীরাঙ্গনার স্বীকৃতি পেয়েছি। এবার ঘর পেলাম।

তিনি বলেন, আমি বাড়ি বাড়ি গিয়ে রান্না করে জীবিকা নির্বাহ করতাম। সামনের দিনে আর হয়তো এই কাজ করতে হবে না। জীবনের শেষ বয়সে এই স্বীকৃতি আমাকে অনেক বেশী শক্তি জোগাবে বাচাঁর।

পরে মায়া রানীর হাতে ১০ কেজি চাল, ৫ কেজি আলু, ২ কেজি তেল, লবন সহ নানা ধরনের খাদ্য সামগ্রী হাতে তুলে দেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ মাসুম রেজা।

এর আগে করোনাকালীন সময়ে জেলার মধুখালীতে দুই জন ও ভাঙ্গা উপজেলায় একজন বীরাঙ্গনার অসুবিধার কথা জানতে পেরে তাদের পাশে দাড়ান জেলা প্রশাসক অতুল সরকার। জেলা প্রশাসকের নির্দেশে ওই দুই উপজেলার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের মাধ্যমে বীরাঙ্গনাদের হাতে তুলে দেওয়া হয় খাদ্য সামগ্রী।

ভাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আজিম উদ্দিন ও ভাঙ্গা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সজীব আহমেদ সহ কর্মকর্তাবৃন্দ বীরাঙ্গনা দেবী আরতি রানী ঘোষের গ্রামের বাড়ি চান্দ্রা ইউনিয়নের মালিগ্রামে যান। এ সময় তাঁর হাতে উপহার ও খাদ্যসামগ্রী তুলে দেন ইউএনও।

এদিকে মধুখালীতেও করোনাকালীন সময়ে বীরাঙ্গনা আম্বিয়া বেগম ও মোছাঃ ফুলজান বেগমের দুরাবস্থার কথা জানতে পারেন জেলা প্রশাসক অতুল সরকার। তাদেরকেও সহায়তা প্রদান করেন তিনি। জেলা প্রশাসকের নির্দেশে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ মোস্তফা মনোয়ার তাদের হাতে খাদ্য সামগ্রী তুলে দেন।

প্রত্যেকের হাতে এক বস্তা চাল, পাঁচ কেজি আলু, তেল, চিনি, সেমাই, মসুর ডাল, পেয়াজ, লবন, মালটা, তরমুজ, কলা, বাঙ্গী ও একটি করে শাড়ি তুলে দেওয়া হয়।

অপরদিকে ১৯৭১ সালের ৭ মে জেলার চরভদ্রাসন উপজেলার গাজিরটেক ইউনিয়নের বালাডাঙ্গী সহ কয়েকটি হিন্দু অধ্যুষিত গ্রামে নির্মম অত্যাচার ও হত্যাকান্ড চালায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। অবর্নণীয় শারিরীক ও মানসিক অত্যাচারের শিকার হন চারুবালা বিশ্বাস। হানাদার বাহিনী চারুবালার স্বামী ও দুই মাসের কোলের সন্তানকে হত্যা করে। বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়।

বিষয়টি জানতে পেরে জেলা প্রশাসক অতুল সরকার তাৎক্ষনিকভাবে চরভদ্রাসন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে সরেজমিন গিয়ে প্রতিবেদন দিতে বলেন। ঘটনার সত্যতা পেয়েছেন উল্লেখ করে প্রতিবেদন দাখিল করেন ইউএনও। সেই প্রতিবেদন সহ সংশ্লিষ্ট কাগজপত্রাদি সহ চারুবালা বিশ্বাসকে নারী মুক্তিযোদ্ধা (বীরাঙ্গনা) হিসেবে স্বীকৃতি প্রদানের জন্য মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ পাঠিয়েছেন জেলা প্রশাসক অতুল সরকার।

ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক অতুল সরকার বলেন, ফরিদপুর বর্ধিত পৌরসভার শোভারামপুর এলাকার বাসিন্দা নিঃসন্তান মায়া রানীকে বীরাঙ্গনার স্বীকৃতি প্রদানে সহায়তা করা হয়েছে। বসবাসের কোন ঘর না থাকায় খুব কষ্টে দিনযাপন করছিলেন তিনি। মায়া রানীর দুরাবস্থার কথা জানতে পেরে তাঁর থাকার জন্য একটি ঘর নির্মাণ করে দেওয়া হচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, করোনাকালীন সময়ে জেলার আরো তিনজন বীরাঙ্গনা অসহায়ভাবে জীবনযাপন করছিলেন এমন খবর পেয়ে তাদের পাশে দাড়িয়েছে জেলা প্রশাসন। তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে খাদ্য সামগ্রী। জেলা প্রশাসন সব সময় অসহায় মানুষের পাশে দাড়িয়েছে, ভবিষ্যতেও পাশে থাকবে।

এই পোস্টটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর