বুধবার, ২৫ মে ২০২২, ০৬:৪৯ পূর্বাহ্ন

করোনাকালে ঈদের আনন্দ

পদ্মা ডেস্ক
  • আপডেটের সময় : শনিবার, ১৫ মে, ২০২১

ছোটবেলার ঈদ ছিল বিস্ময়াভিভূত এক আনন্দের নাম। সারা বছর অপেক্ষায় থাকতাম ঈদের দিনটির জন্য। মফস্বল শহরে বেড়ে ওঠা বৈচিত্র্যহীন জীবনে ঈদ আসতো অপার বিস্ময় আর আনন্দের পসরা সাজিয়ে। রোজার দিনগুলোতে আঙ্গুলে গুণে গুণে প্রতীক্ষা করতাম কাঙ্ক্ষিত দিনটির জন্য। একমাস পর ঠিকই ‘ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’। বাবা মায়ের কিনে দেওয়া জামা জুতো পরে আনন্দে আত্মহারা হয়ে বন্ধুদের বাসায় বাসায় ঘুরতাম আর সেমাই খেতাম। সন্ধ্যাবেলা ক্লান্ত শরীরে টিভির (বিটিভি) সামনে বসে ঈদের অনুষ্ঠান দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়তাম। মনে হতো, আহ! পৃথিবীটা এত সুখের, এত আনন্দের।

তবে সময়ের তালে বয়সের কালে ঈদের আনন্দ হয়েছে কিছুটা ফিকে। বয়স বাড়লে ঈদ আসে কিছু পরিমাণ আনন্দের সাথে খানিকটা অস্বস্তি নিয়েও । কারণ ততোদিনে সিন্দাবাদের ভূতের মতো কাঁধে চেপেছে অনেক দায়িত্ব । সীমিত সাধ্যের ভেতরে অংক কষে সবাইকে খুশি করাটা বিরাট দুঃসাধ্যের ব্যাপার। প্রিয়জনদের উপহার দিয়ে খুশি করতে পারার বিপুল আনন্দের সাথে, না দিতে পারার কষ্টটাও যে অনেক বেশি।

তবে এটাও ঠিক, উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত কিংবা বিত্তহীন সবাই ঈদ আনন্দে শরিক হয়, যার যার অবস্থা ও অবস্থানে থেকে। আনন্দ তো নানা রকম। কারো আনন্দ দিয়ে, আবার কারো বা পেয়ে। একজনের আনন্দ দেখেও কখনো ককনো অন্যজনকে আনন্দ পেতে দেখা যায় না, ডা-ও তো নয়! ঈদ যেন একটি নির্দিষ্ট দিনে আনন্দ আয়োজনের ঐক্যসূত্র।

এবার ঈদের প্রেক্ষাপট ভিন্ন । গত বছরও এমনই ছিল। এক অতিক্ষুদ্র অথচ ভয়ানক ভাইরাস ওঁৎ পেতে আছে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে তাকে হনন করার জন্য । কোভিড-১৯ মহামারির নিকষ কালো ভয়ঙ্কর সময় পার করছে পৃথিবীবাসী। করোনাভাইরাসের ভয়াল থাবায় বেঁচে থাকার বোধটাই সংকীর্ণ হয়ে পড়েছে। বাতাসে এখন মৃত্যুর গন্ধ। উদ্ধতভঙ্গিতে আলিঙ্গন করতে প্রস্তুত মৃত্যুর হিমশীতল বাহু। জীবন এবং মৃত্যুর ফারাকটা ভয়ঙ্করভাবে কমে এসেছে। ক্ষুদ্র এক ভাইরাস আমাদের জীবন ওলট-পালট করে দিয়ে ক্রমশ নতুন নতুন উপলব্ধির মধ্য দিয়ে ভিন্ন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি করেছে। গত এক বছরে স্বজন, প্রিয়জন, পরিচিত, অপরিচিত অসংখ্য মানুষ এই পৃথিবীর মায়া না কাটিয়েই অদৃশ্য হয়ে গেল। দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর মৃত্যুর মিছিল দেখতে দেখতে বিমর্ষ হয়ে পড়েছি, ডাক আসতে পারে যেকোনো সময় নিজেরও।

মৃত্যু চিরসত্য, জীবন অনিত্য ; তবে সংখ্যাতিরিক্ত হঠাৎ মৃত্যু বহুগুণ বেদনার, কষ্টের, যন্ত্রণার। অকস্মাৎ মৃত্যুর এই আঘাতে অনেক পরিবার ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। স্বপ্নেরা সব হারিয়ে গেছে দূর কোনো মহাজগতে।

এমনই এক ভয়ঙ্কর অস্থির সময়ে পুরোপুরি কল্পনারও বাইরের বাস্তবতায় ঈদুল ফিতর এসেছে। আশা, আকাঙ্খা, আনন্দ, স্বপ্ন দেখা….এমনসব আবেগীয় বিষয়গুলো এখন একটু ভিন্ন রকম । বেঁচে থাকাটাই যখন দায় তখন ঈদের আনন্দ অনুভূতি সবার কাছে সমানভাবে হয়তো অনুভূত হবে না। তবে মানুষের হার না মানার যে প্রবল ইচ্ছাশক্তি, তা তাকে তাড়িত করে। একদিকে অতীত আনন্দ বা সুখের স্মৃতি রোমন্থনে ভয় অন্যদিকে নতুন আনন্দে সামিল হওয়ার তাগিদ – দুইয়ের দ্বন্দ্বে শেষে একটার হয় জয়। স্মৃতিরা প্রচণ্ড নাড়া দিয়ে যায়…একদিন আমাদেরও মায়াভরা আনন্দময় একটা জীবন ছিল। আজ পরিসর বা আয়োজন সীমিত হলেও বঞ্চিত থাকা নয়। যার যেমন সামর্থ্য, তার তেমন উদ্যোগ-আয়োজন। আনন্দ থেকে দূরে থাকা নয়!

আনন্দ আর বেদনা তো হাত ধরেই চলে। গত ঈদেও আমাদের অনেকেরই স্বজন-প্রিয়জন একসঙ্গে ছিল, এবার হয়তো নেই। যাদের পরমাত্মীয় চিরবিদায় নিয়ে চলে গেছেন, তারাই শুধু জানেন প্রিয়জন হারানোর ব্যথা কতটা মর্মস্পর্শী, কতটা আত্মদহনের। কষ্টগুলো ফেনিয়ে ওঠে, বুকের ভেতরটা হু হু করে ; শোকে মুহ্যমান এই সময়ের ঈদ তাই কখনো আনন্দের পরশ বুলাতে পারে না। প্রিয়জন হারানো স্বজনের কাছে এবারের ঈদ প্রচণ্ড যন্ত্রণা বয়ে এনেছে বৈকি।

তবে আলোকের ঝর্নাধারায় ধুইয়ে দেওয়ার মতো মহামারির উল্টো পিঠে আছে মানবিকতার মহান উপাখ্যান। করোনার কারণে সামাজিক বা শারীরিক বিচ্ছিন্নতা বাড়লেও শেষ হয়ে যায়নি সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি আর ভালোবাসার প্রগাঢ় বন্ধন। মানুষের প্রতি ভালোবাসার শক্ত করার ইচ্ছাটার মৃত্যু হয়নি, বরং কিছুটা যেন সুতীব্র হয়েছে । সামাজিক বিচ্ছিন্নতা দূরকে আপন করার, হৃদয়কে এনেছে হৃদয়ের খুব কাছাকাছি আনার প্রবণতা যেন বাড়িয়ে দিয়েছে। তাই নাড়ির টানে প্রিয়জনের সান্নিধ্যের প্রত্যাশায় মহামারিকেও তুচ্ছজ্ঞান করে ঝুঁকি নিয়ে, কতরকম কষ্ট সয়ে মানুষ ছুটছে নাড়ির টানে, বাড়ির পানে। ঈদ যে সত্যি মিলনের ডাক নিয়ে আসে, দূরকে কাছে টানে! করোনা তার ব্যতিক্রম ঘটাবে কেমন করে?

আগেও মহামারি থেকে সেরে উঠেছিল এ বিপুলা পৃথিবী। এবারও নিশ্চয় তার ব্যত্যয় হবে না । ইতিহাসের স্বল্পতম সময়ে আবিষ্কার হয়েছে ভ্যাকসিন। সে ভ্যাকসিন কতটুকু কাজ করবে তা সময়ই বলে দেবে। নিশ্চিত এ ঝড় থেমে যাবে। শান্ত সুবিমল এ ধরিত্রীতে আবারো প্রাণের জোয়ার বইবে । আসবে আলো ঝলমলে সোনালি দিন । কোলাহল মুখরিত এমনই দিনে আবারো জমবে প্রাণের মেলা।

সবাই নিরাপদে থাকুন। ঈদের শুভেচ্ছা।

লেখক : লাভা মাহমুদা।

এই পোস্টটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর