মঙ্গলবার, ২৪ মে ২০২২, ০৯:০১ পূর্বাহ্ন

এগিয়ে যাচ্ছে মেগা প্রকল্পগুলো, সুফলের দ্বারপ্রান্তে বাংলাদেশ

পদ্মা ডেস্ক
  • আপডেটের সময় : শনিবার, ২৭ নভেম্বর, ২০২১

আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতায় যাওয়ার পর কয়েকটি বড় প্রকল্পের কাজ শুরু করে। সরকারের অগ্রাধিকারমূলক এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে তদারকি করছেন। এর মধ্যে পদ্মা সেতু-মেট্রোরেলসহ কিছু প্রকল্পের সুফল পাওয়ার দ্বারপ্রান্তে বাংলাদেশ। অন্যান্য প্রকল্পের অগ্রগতিও সন্তোষজনক।

করোনা সংকট কাটিয়ে পুরোদমে বাস্তবায়ন হচ্ছে প্রকল্পগুলো। সরকার আগামী বছরের ডিসেম্বরে বাংলাদেশের প্রথম মেট্রোরেলের উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত অংশের বাণিজ্যিক চলাচল শুরুর পরিকল্পনা করেছে। এছাড়া একই বছরের জুন মাসেই পদ্মা সেতু উদ্বোধন করা হবে। এই দুটিসহ মোট আটটি মেগা প্রকল্পের অগ্রগতি প্রকাশ করেছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়।

সরকারের মেগা প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে- পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্প, মেট্রোরেল প্রকল্প, পদ্মা সেতুর রেল সংযোগ প্রকল্প, দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার এবং রামু হয়ে ঘুমধুম পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণ প্রকল্প, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প, মাতারবাড়ী কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প, এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্প, কয়লাভিত্তিক রামপাল থার্মাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প, পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ প্রকল্প ও সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ প্রকল্প।

মেগা প্রকল্পগুলো নিয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, ‘মেগা প্রকলগুলো চালু হলে দেশের সার্বিক চিত্র বদলে যাবে। মাথাপিছু আয় ও প্রবৃদ্ধি আরও বেড়ে যাবে। মেগা প্রকল্পগুলোর সুফল পেতে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতেও (এডিবি) বরাদ্দ পর্যাপ্ত দেওয়া হয়। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে প্রকল্পগুলো তদারকি করা হচ্ছে। আশা করি, খুবই কম সময়ের মধ্যে পদ্মা সেতু ও মেট্রোরেলের মতো প্রকল্পের সুফল পাবে পুরো জাতি।’

পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্প
সরকারের সবচেয়ে অগ্রাধিকারভিত্তিক প্রকল্পগুলোর মধ্যে অন্যতম পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্প। ২০২১ সালের অক্টোবর পর্যন্ত পদ্মা সেতু প্রকল্পের মোট অগ্রগতি ৮৮ দশমিক ৭৫ শতাংশ। প্রকল্পের আওতায় এরই মধ্যে ২৬ হাজার ২৪৮ কোটি ৫৯ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। সেতুর মোট দৈর্ঘ্য ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার। দ্বিতল এ সেতুর ৪২টি পিলারে মোট ৪১টি স্প্যান বসেছে। এই সেতুর ওপর দিয়ে গাড়ি আর নিচ দিয়ে ট্রেন চলাচল করবে।

মেট্রোরেল প্রকল্প
আগামী বছরের ডিসেম্বরে বাংলাদেশের প্রথম মেট্রোরেলের উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত অংশের বাণিজ্যিক চলাচল শুরুর পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। ২০ দশমিক ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ প্রকল্পটি উত্তরা তৃতীয় পর্ব থেকে কমলাপুর পর্যন্ত নির্মাণ করা হবে। প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি ৭২ শতাংশ। তবে উত্তরা তৃতীয় পর্ব থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত প্রকল্পের অগ্রগতি ৮৯ দশমিক ৬১ শতাংশ। প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২২ হাজার কোটি টাকা।

পদ্মা সেতুর রেল সংযোগ প্রকল্প
চীনের অর্থায়নে এগিয়ে যাচ্ছে পদ্মা সেতুর রেল সংযোগ প্রকল্প। ঢাকা থেকে যশোর পর্যন্ত ১৭২ কিলোমিটার ব্রডগেজ রেললাইন নির্মাণের মাধ্যমে বহুল আকাঙ্ক্ষিত পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে জাতীয় ও আন্তঃদেশীয় রেল যোগাযোগ স্থাপিত হবে। এ রেলপথটি দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ২৩টি জেলায় প্রথম রেলসংযোগ স্থাপন করবে। প্রকল্পের মোট অগ্রগতি ৪৬ শতাংশ ও আর্থিক অগ্রগতি ১৯ হাজার ৯১০ কোটি টাকা।

প্রকল্পে মোট ব্যয় হবে ৩৯ হাজার ২৪৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে চীনের ঋণ ২১ হাজার ৩৬ কোটি টাকা। বাকি অর্থায়ন সরকারি কোষাগার থেকে মেটানো হবে। সেতুর রেল সংযোগটি ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, নড়াইল ও যশোরের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করবে। ২০১৮ সালের অক্টোবরে মাওয়ায় পদ্মা সেতু ও রেল সংযোগ নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রকল্পটি ২০২৪ সালের জুন মাসে শেষ হবে।

দোহাজারী-রামু-ঘুমধুম রেললাইন প্রকল্প
চট্টগ্রামের দোহাজারী থেকে কক্সবাজারের রামু হয়ে ঘুমধুম পর্যন্ত ১৮৮ কিলোমিটার রেললাইন নির্মাণের কাজ চলমান। প্রকল্পের অগ্রগতি ৬৪ শতাংশ এবং প্রকল্পের আওতায় মোট ৫ হাজার ৯৮০ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১৮ হাজার ৩৪ কোটি টাকা। প্রকল্পের বৈদেশিক ঋণ ১৩ হাজার ১১৫ কোটি টাকা ও বাকি টাকা সরকারি কোষাগার থেকে মেটানো হবে।

প্রকল্পের অধীনে পর্যটন নগরী কক্সবাজারে হচ্ছে ঝিনুক আকৃতির আইকনিক স্টেশন। সাঙ্গু, মাতামুহুরী ও বাঁকখালী নদীর ওপর নির্মিত হচ্ছে তিনটি বড় সেতু। সাতকানিয়ার কেঁওচিয়ায় নির্মাণ হচ্ছে উড়াল সেতু। ফলে পর্যটন শহর কক্সবাজার ও সেখানে নির্মাণাধীন গভীর সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে যোগাযোগের পথ সুগম হবে। ২০২২ সালের জুন মাসে প্রকল্পের কাজ শেষ হবে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প
২০১৫ সালের ডিসেম্বরে পাবনার রূপপুরে ২৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করতে রাশিয়ার এটমস্ট্রয় এক্সপোর্ট নামে একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি সই করে সরকার। চুক্তি বাস্তবায়নের সময়কাল ধরা হয়েছে সাত বছর। বিদ্যুৎকেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট ২০২৩ সালে ও দ্বিতীয় ইউনিট ২০২৪ সালের অক্টোবরে উৎপাদনের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।

বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ৬০ বছর ধরে বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে। এক লাখ এক হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে রাশিয়ার সহযোগিতায় বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ হচ্ছে পাবনার রূপপুরে, যেখানে দুটি ইউনিটে ১২০০ মেগাওয়াট করে ২৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে। প্রকল্পের মোট অগ্রগতি ৪০ দশমিক ৩৪ শতাংশ। এরই মধ্যে প্রকল্পের আওতায় মোট ব্যয় হয়েছে ৪৩ হাজার ৯৭৮ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রকল্পের কাজ শেষ হবে।

পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ প্রকল্প
সরকারের মেগা প্রকল্পগুলোর মধ্যে পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ প্রকল্পের অগ্রগতি ভালো। এরই মধ্যে বন্দরটির কার্যক্রম মোটামুটি মাত্রায় শুরু হয়েছে। প্রকল্পের মোট অগ্রগতি ৮৩ শতাংশ। প্রকল্পের আওতায় এখন পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে তিন হাজার ৮৪ কোটি টাকা। প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের জুন মাসে প্রকল্পের কাজ শতভাগ সম্পন্ন হবে।

পায়রা থেকে ঢাকামুখী যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের কাজও চলছে দ্রুতগতিতে। সরকারের লক্ষ্য ২০২৩ সালের মধ্যে ১৬ মিটার গভীরতায় চ্যানেল ড্রেজিং সম্পন্ন করে পূর্ণাঙ্গ বন্দর সুবিধা গড়ে তোলা। মূলত চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর চাপ কমাতে পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়ায় রাবনাবাদ চ্যানেলে পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করা হচ্ছে।

মাতারবাড়ি কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প
কক্সবাজার জেলার মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়িতে বিদ্যুতের হাব গড়ে তোলার মহাপরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এজন্য শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়, পুরো এলাকাটিকেই একটি আধুনিক শিল্প এলাকা হিসেবে গড়ে তোলা হবে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। মাতারবাড়ি ও ঢালঘাটা ইউনিয়নের এক হাজার ৪১৪ একর জমিতে এ প্রকল্পটি নির্মাণ করা হচ্ছে।

কয়লাভিত্তিক এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণ করা হবে আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তিতে। প্রকল্পের আওতায় ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন দুটি স্টিম টারবাইন, সার্কুলেটিং কুলিং ওয়াটার স্টেশন স্থাপন, ২৭৫ মিটার উচ্চতার চিমনি ও পানি শোধন ব্যবস্থা স্থাপন করা হবে। কয়লা আমদানির জন্য নদীতে ৭ কিলোমিটার নৌচ্যানেল তৈরি করা হবে। পাশাপাশি কয়লা ওঠানামার জন্য নির্মাণ করা হবে জেটি।

২০১৫ সালের আগস্টে মাতারবাড়িতে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে ৩৬ হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন দেয় সরকার। প্রকল্পের ২৯ হাজার কোটি টাকা দেবে জাপান আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা-জাইকা। বাকি ৫ হাজার কোটি টাকা সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে দেওয়া হবে। অবশিষ্ট অর্থের জোগান দেবে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী ও স্বত্বাধিকারী কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিপিজিসিবিএল)। প্রকল্পের মোট অগ্রগতি ৬০ দশমিক ৮০ শতাংশ। এরই মধ্যে প্রকল্পের আওতায় মোট খরচ হয়েছে ১৮ হাজার ৫৬৪ কোটি টাকা।

তবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণ হিসেবে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে দায়ী করা হচ্ছে। ফলে সরকার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে সরে যাচ্ছে। এজন্য কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে নতুন করে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে না। সূত্র : জাগো নিউজ।

এই পোস্টটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর