বুধবার, ২৫ মে ২০২২, ০৭:১৭ পূর্বাহ্ন

খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে ফরিদপুর বক্ষব্যাধি হাসপাতাল ও ক্লিনিক

পদ্মা ডেস্ক
  • আপডেটের সময় : শনিবার, ১৯ মার্চ, ২০২২

ফরিদপুরের বক্ষব্যাধি হাসপাতাল ও ক্লিনিক নানা সমস্যায় জর্জরিত। হাসপাতালের পুরনো ভবন, নিরাপত্তার অভাব, জনবল-সংকট ও নষ্ট জেনারেটর নিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে ২০ শয্যার হাসপাতালটি। সেবাবঞ্চিত হচ্ছেন জেলার রোগীরা। সেবার মান নিয়ে আক্ষেপ রয়েছে খোদ হাসপাতালের চিকিৎসক ও কর্মরতদের।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ১৯৬১ সালে আট একর জমির ওপর ফরিদপুর শহরতলির ভাজনডাঙ্গা এলাকায় ফরিদপুর বক্ষব্যাধি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের কার্যক্রম শুরু হয়। এরমধ্যে একটি পুকুরসহ পাঁচ একর জমির ওপর স্থাপিত বক্ষব্যাধি হাসপাতাল। পাশে তিন একর জমির ওপর রয়েছে বক্ষব্যাধি ক্লিনিক। আর চারদিক সীমানা প্রাচীর দিয়ে ঘেরা।

হাসপাতালে বর্তমানে সাত জন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। নারী ওয়ার্ডে পাঁচ জন ও পুরুষ ওয়ার্ডে দুই জন। এরমধ্যে চার জন যক্ষ্মা রোগী, বাকি তিন জনের রয়েছে শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা।

কোনও রোগী রাতে হাসপাতালে থাকেন না। তারা সকাল ৮টার দিকে হাসপাতালে আসেন এবং বেলা আড়াইটা-৩টার দিকে বাড়িতে চলে যান। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন যে সাত রোগী রয়েছেন, তাদের সবার বাড়ি ওই হাসপাতালের আশপাশের এলাকায়।

পুরুষ ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন শহরের টেপাখোলার বাসিন্দা বৃদ্ধ শহিদউদ্দিন জানান, দুই মাস ধরে তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। হাসপাতালে ভর্তি থাকলে তিন বেলা খাবার পান, তাই ভর্তি আছেন। তবে চিকিৎসা সেবা তেমন পান না বলে দাবি তার।

তিনি বলেন, সকালে হাসপাতালে আসি, দুপুরে চলে যাই। দুপুরে কেন চলে যান প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সন্ধ্যা হলে কেউ থাকে না। সন্ধ্যার পর মাদকসেবীরা এখানে আড্ডা দেওয়া শুরু করে। তাই ভয়ে চলে যাই।

নারী ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রয়েছেন শহরের টেপাখোলা ব্যাপারিপাড়ার বাসিন্দা মলিনা বেপারি (৫০)। তিনি যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত। দুই মাস ধরে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তিনি বলেন, কিছুটা সুস্থ হয়েছি। এখান থেকে তিন বেলা খাবার ও ওষুধ পাই।

চিকিৎসাধীন বাইদা পাড়ার বাসিন্দা জানে আলম বলেন, যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হয়ে তিন মাস ধরে চিকিৎসাধীন রয়েছি। রাতে নিরাপত্তা না থাকায় হাসপাতালে থাকি না, যে যার বাড়িতে চলে যাই।

হাসপাতালে রান্নার দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছেন বাবুর্চি হিরা খানম। তিনি জানান, তিনি বর্তমানে সাত জনের জন্য রান্না করেন। সকালে কলা-পাউরুটি ও ডিম দেওয়া হয়। দুপুর ও রাতে ভাত ও তরকারি দেওয়া হয়। যেদিন মাছ রান্না হয়, সেদিন প্রত্যেক রোগীকে ১৫০ গ্রাম মাছ এবং যেদিন মাংস রান্না হয়, সেদিন প্রত্যেক রোগীকে ৫৬ গ্রাম মাংস দেওয়া হয়।

স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল হালিম শেখ বলেন, হাসপাতালটির বেহাল অবস্থা। রোগীরা সঠিক সেবা পাচ্ছেন না। সকালে এসে বিকালে রোগীরা চলে যান। কেউ ভর্তি থাকেন না। আমরা চাই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ হাসপাতালটির দিকে নজর দিক। তাহলে সাধারণ মানুষ উপকৃত হবে।

হাসপাতাল ও ক্লিনিক সূত্রে জানা গেছে, বক্ষব্যাধি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে রয়েছে জনবলের সংকট। ক্লিনিকে জুনিয়র কনসালট্যান্ট থেকে শুরু করে আয়া পর্যন্ত মোট পদ আছে ১৭টি। এরমধ্যে একজন মেডিক্যাল অফিসার, একজন আয়া ও অফিস সহকারীসহ রয়েছেন ছয় জন।

অপরদিকে, বক্ষব্যাধি হাসপাতালে মেডিক্যাল অফিসার, ফার্মাসিস্টসহ পদ রয়েছে ১৯টি। এর বিপরীতে কর্মরত আছেন ১৭ জন। এরমধ্যে তিন জন ওয়ার্ড বয় ও দুজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী জেনারেল হাসপাতাল ও সিভিল সার্জনের কার্যালয়ে ডেপুটেশনে রয়েছেন। এ ছাড়া আট জন স্টাফ নার্সের মধ্যে চার জন বর্তমানে করোনার টিকা দেওয়ার কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। ফলে হাসপাতালে কাজ করার সুযোগ নেই তাদের।

চরভদ্রাসন থেকে আসা যক্ষ্মা রোগী মাইনুদ্দিন বলেন, চরভদ্রাসন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে এখানে পাঠিয়েছে আমাকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার জন্য। কিন্তু সব ধরনের পরীক্ষা এখান থেকে করতে পারিনি। বাইরে থেকে করতে হয়েছে।

ফরিদপুর বক্ষব্যাধি হাসপাতালের মেডিক্যাল অফিসার ডা. মেরিনা পারভীন বলেন, লোকবল সংকট বড় সমস্যা। পাশাপাশি ডেপুটেশনে থাকায় এ সমস্যা আরও জোরালো হচ্ছে। এলাকাবাসীর আচরণগত সমস্যা আছে। রোগীরা রাতে থাকেন না নিরাপত্তার অভাবে। সীমানা প্রাচীর ঠিক করে দেওয়ার জন্য বহুবার কর্তৃপক্ষের কাছে লেখা হয়েছে। কিন্তু সমাধান হয়নি।

তিনি বলেন, হাসপাতালের অনেক যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে আছে। জেনারেটর বহুদিন ধরে নষ্ট। সম্প্রতি একটি এক্স-রে মেশিন দেওয়ায় কাজ করা যাচ্ছে। কফ পরীক্ষা করা হয়। যক্ষ্মা রোগীদের আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা নিয়মিত করা প্রয়োজন। বিশেষত রক্তের সব ধরনের পরীক্ষা করার প্রয়োজনীয়তা বেশি। এখানে করা সম্ভব নয় বলে রোগীদের বাইরে থেকে করাতে হয়। মেশিন না থাকাসহ নানা প্রতিকূলতা রয়েছে। তবে ওষুধের সংকট নেই। প্রতিদিন গড়ে ৩০ জন রোগী আউটডোরে চিকিৎসা নিয়ে থাকেন। এছাড়া বর্তমানে সাত জন রোগী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। দূর থেকে আসা রোগীরা ভর্তি থাকতে চান না। কারণ, আশপাশে নেই খাবারের দোকান। রোগীর স্বজনদের খাবারের ব্যবস্থা না থাকায় তারা থাকতে চান না।

ডা. মেরিনা পারভীন বলেন, তাছাড়া নিরাপত্তার বিষয়টি রয়েছে। সন্ধ্যার পর থেকেই এই এলাকায় মাদকসেবীদের চলাচল বেড়ে যায়। আমাদের লোকবল সংকটের কারণে কিছুই করতে পারি না। বিষয়গুলো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে।

ফরিদপুরের সিভিল সার্জন ডা. মো. ছিদ্দীকুর রহমান বলেন, বক্ষব্যাধি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের সমস্যার ব্যাপারে আমরা অবগত আছি। সমস্যার সমাধান এবং জনবল সংকট কাটানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।

এই পোস্টটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর