বুধবার, ২৫ মে ২০২২, ০১:৫৪ পূর্বাহ্ন

মৃত্যুকে কাছ থেকে দেখা সামিউলের মুখে রোমহর্ষক বর্ণনা

পদ্মা ডেস্ক
  • আপডেটের সময় : শনিবার, ১৯ মার্চ, ২০২২

মৃত্যুকে কাছ থেকে দেখার পর জীবন নিয়ে ফিরে এসেছেন ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার দক্ষিণ কাইচাইল গ্রামের ইউনুস শেখের ছেলে সামিউল শেখ (২১)। দালালের মাধ্যমে লিবিয়া হয়ে ইতালিতে যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়ার সময় তাঁদের নৌকা ডুবে যায়। নৌকায় সামিউলসহ কাইচাইল ইউনিয়নের আরও তিন তরুণ ছিলেন। এর মধ্যে সামিউল একাই বেঁচে ফিরেছেন। নৌকাডুবিতে মারা যান তাঁর দুই বন্ধু বাবুর কাইচাইল গ্রামের ফারুক মাতুব্বরের ছেলে ফয়সাল মাতুব্বর (১৯) ও মাজেদ মিয়ার ছেলে নাজমুল মিয়া (২২)।

১০ মার্চ বাড়িতে আসেন সামিউল। গত রোববার সামিউলের বাড়িতে তাঁর সঙ্গে প্রতিবেদকের কথা হয়। দুই বন্ধুকে হারিয়ে মৃত্যুকে কাছ থেকে দেখা সামিউল তাঁর বেঁচে ফেরার রোমহর্ষ বর্ণনা দেন।

সামিউলের ভাষ্যমতে, গত ২৭ জানুয়ারি তাঁদের জাহাজে তোলার জন্য লিবিয়ার জোয়ারা ঘাটে নিয়ে যান দালাল অলিদ। আগেই বলা হয়েছিল, তিনতলা একটি জাহাজে তোলা হবে, সঙ্গে থাকবে লাইফ জ্যাকেট এবং পর্যাপ্ত শুকনা খাবার। কিন্তু ঘাটে গিয়ে দেখা গেল, সেখানে ১৫ থেকে ২০ জন ধারণক্ষমতার একটি মাঝারি আকারের স্পিডবোট রাখা। কিন্তু স্পিডবোটে ২ চালকসহ মোট ৩৭ জনকে তোলা হয়। স্পিডবোট ছোট এবং শুকনা খাবার ও লাইফ জ্যাকেট না দেওয়ায় অনেকে স্পিডবোটে উঠতে না চাইলে দালাল অলিদ তাঁদের বুকে পিস্তল ঠেকিয়ে ভয় দেখান। এ সময় চার-পাঁচটি ফাঁকা গুলিও ছোড়েন। বাধ্য হয়ে সবাই বোটে ওঠেন। প্রায় সাড়ে আট ঘণ্টা চলার পর হঠাৎ ঝোড়ো বাতাসে স্পিডবোটটি উল্টে যায়।

সামিউল বলেন, ‘আমাদের স্পিডবোট উল্টে গেলে ঢেউয়ের সঙ্গে চালকসহ ২৯ জন ভেসে যান। স্পিডবোটের অন্য পাশে আমরা আটজন ধরে থাকি। দেড় থেকে দুই ঘণ্টা পর আমার বন্ধু নাজমুল ঢেউয়ের তোড়ে হারিয়ে যায়। এরপর আমরা সাতজন বোটের অন্য পাশে ভাসতে ভাসতে তিউনিসিয়া সীমান্তে চলে যাই। তখন আমাদের গায়ে কোনো কাপড় ছিল না। এভাবে সাড়ে ১১ ঘণ্টা ভাসতে থাকি। দূরে একটি জাহাজ দেখে আমাদের মধ্যে একজন নরসিংদীর ফারুক একটি লাল গেঞ্জি উঁচু করেন। জাহাজটি ছিল লিবিয়ার কোস্টগার্ডের। তাঁরা আমাদের দেখতে পেয়ে তিউনিসিয়া সীমান্ত থেকে উদ্ধার করেন। জাহাজে তুলে তাঁরা আমাদের বুটের জুতা দিয়ে লাথি মারতে থাকেন। আমাদের অপরাধ, আমরা অবৈধভাবে বিদেশে যাচ্ছিলাম। জাহাজে আরেক সহযাত্রী রাশেদুল মারা যান। তাঁর দাফন হয় লিবিয়ায়।’

ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালিতে যাওয়ার পথে মিসরের ২ চালকসহ মোট ৩৭ জনের মধ্যে বেঁচে ফেরেন ৬ জন। তাঁরা হলেন নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার হাসনাবাদ গ্রামের ইউসুফ মৃধা, একই জেলার নালিখা গ্রামের ইয়াসিন, বেলাব থানার ফারুক, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জাকির, মাদারীপুরের ইউনুস ও নগরকান্দার সামিউল শেখ।

সামিউল আরও বলেন, ‘জাহাজে ওঠার পর আমাদের শারীরিক অবস্থা ছিল খুবই শোচনীয়। কারণ, সাড়ে ১১ ঘণ্টা আমরা কিছুই না খেয়ে সমুদ্রে ভাসছিলাম। পুলিশের কাছে খাবার চাইলে সামান্য এক টুকরা রুটি আর পানি দেওয়া হতো। ২৮ জানুয়ারি সন্ধ্যায় আমাদের ছয়জনকে লিবিয়ার জাউইয়া ঘাটে নামানো হয়। পরে সেখান থেকে জাউইয়া জেলে নেওয়া হয়। সেখানে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত থাকি। পরে খামছাখামছিন জেলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে থাকতে হয় ১ মাস ২৮ দিন। জেলে বন্দী অবস্থায় বেলা ১১টায় লিবিয়ার স্থানীয় খাবার খুবজু (আনুমানিক ১০০ গ্রাম ওজনের একটি রুটি) এবং রাত ১১টায় আরেকটি খুবজু দেওয়া হতো। খুবজু দেওয়ার সময় প্রতিদিন দুবার পানির বোতলের ছিপি মেপে ২ থেকে ৩ ছিপি পরিমাণ পানি দেওয়া হতো।’

সামিউল বলেন, ‘পিপাসায় পানি চাইলেও দেওয়া হতো না। আমাদের ওপর শারীরিক নির্যাতনও চলত। এর মধ্যে ১৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ দূতাবাস ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) থেকে যোগাযোগ করা হয়। আইওএম আমাদের দেশে ফিরে আসার ব্যবস্থা করে এবং ঢাকার শাহজালাল বিমানবন্দরে আসার পর বাড়িতে যাওয়ার জন্য প্রত্যেককে ৪ হাজার ৭৮০ টাকা দেয়। আমরা ২ মার্চ ঢাকায় ফিরে আসি। সাত দিন বিমানবন্দরের পাশে হজ ক্যাম্পে কোয়ারেন্টিন শেষে ১০ মার্চ বাড়িতে ফিরি।’

লিবিয়ায় প্রায় দুই মাস ‘বন্দী’

গত বছরের ১ ডিসেম্বর দুবাই থেকে বিমানে তিন বন্ধুসহ সামিউল লিবিয়ায় পৌঁছান। সেখানে প্রায় দুই মাস তাঁদের একটি বদ্ধ ঘরে থাকতে হয়। বাইরে বের হতে চাইলে দালাল চক্র তাঁদের ভয় দেখিয়ে বলত, বাইরে যুদ্ধ হচ্ছে এবং মালিকের সাতটি পিস্তল আছে, বের হলে গুলিতে প্রাণহানির আশঙ্কা আছে। তাই তাঁরা ঘরের মধ্যে থাকতেন।

সামিউল বলেন, ‘আমরা ৩ বন্ধুসহ প্রায় ২০ জন ছোট্ট একটি কক্ষে প্রায় ২ মাস একধরনের বন্দী ছিলাম। সেখানে আমাদের তিনবার খাবার দেওয়া হতো। রুটির মতো স্থানীয় খাবার খুবজু দেওয়া হতো সকালে ও দুপুরে। রাতে কখনো কখনো সামান্য ভাত দেওয়া হতো। দালাল রাসেল ও শওকত মাতুব্বর লিবিয়ায় অবস্থানকারী নরসিংদীর দালাল মনির শীলের কাছে আমাদের বিক্রি করে দেন। পরে মনির শীল লিবিয়ার দালাল অলিদের কাছে বিক্রি করে দেন।’

সামিউল আরও জানান, এর আগে গত ১৪ নভেম্বর ঢাকায় যান সামিউলসহ ওই তিন তরুণ। ঢাকার কাকরাইল এলাকার আল হেলাল বোর্ডিংয়ে তিন দিন থাকেন। সেখান থেকে ১৭ নভেম্বর শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে দুবাইয়ে যান। সেখানে দালাল শওকতের ভাই জুয়েল মাতুব্বরের কাছে পৌঁছান ১৮ নভেম্বর। ১ ডিসেম্বর বিমানে লিবিয়ায় পৌঁছান। লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালিতে যেতে স্পিডবোটে ২৭ জানুয়ারি রওনা দেন।

অবৈধভাবে ভূমধ্যসাগর পাড়ির সঙ্গে জড়িত দালাল চক্রের মধ্যে দেশে আছেন দুজন। আর লিবিয়ায় দুজন। দেশের দুই দালাল হলেন নগরকান্দার কাইচাইল ইউনিয়নের ছোট নাওডুবি গ্রামের হান্নান মাতুব্বরের ছেলে শাহিন মাতুব্বর (৪১) ও মৃত শামসুদ্দিন মাতুব্বরের ছেলে ইলিয়াস মাতুব্বর (৩৯)। আর লিবিয়ার দুজন হলেন ছোট নাওডুবি গ্রামের মৃত শামছুদ্দিন মাতুব্বরের ছেলে শওকত মাতুব্বর (২৫) ও চানু মাতুব্বরের ছেলে রাসেল মাতুব্বর (৩৫)। চার বছর ধরে তাঁরা লিবিয়ায় থাকেন।

দেশের দুই দালাল দুই দফায় নাজমুল, সামিউল ও ফয়সালের বাড়ি থেকে ৭ লাখ ৬০ হাজার টাকা করে নেন। তাঁরা একই পদ্ধতিতে আট থেকে নয়জন তরুণকে ইতালিতে নিয়েছেন। প্রতি মাসে এক থেকে দেড় লাখ টাকা বেতন, বাড়িতে কোনো অভাব থাকবে না, এসবের প্রলোভন দেখিয়ে দালাল চক্র তাঁদের ঝুঁকিপূর্ণ পথে ইতালিতে যাওয়ার ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করে।

বেঁচে ফেরা সামিউল দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তৃতীয়। বড় ভাই শাহিন শেখ (২৮) সংসারী, বড় বোনের (২৬) বিয়ে হয় ছয় বছর আগে। ছোট বোন (১৪) নগরকান্দার একটি মাদ্রাসায় পড়ে। সামিউল সরকারি নগরকান্দা মহাবিদ্যালয়ের এইচএসসি পরীক্ষার্থী ছিলেন। বিদেশে যাওয়ায় তাঁর পরীক্ষা দেওয়া হয়নি।

সামিউলের মা সালমা বেগম বলেন, ‘আমার জাদুরে ফিইরা পাব, আশা করি নাই। ছোয়াল আমার ফিইরা আইছে। আমার ভালো লাগছে। কিন্তু কষ্ট হইতেছে অন্য দুই মায়ের জন্য। আমিও মা। আমি জানি, সন্তান মায়ের কাছে কী। কী দিয়া ফয়সাল ও নাজমুলের মাকে সান্ত্বনা দেব।’ ফয়সালের বাবা ফারুক মাতুব্বর বলেন, ‘যারা এ কাজ করেছে, তারা আমার আত্মীয়। ভালো হবে বইলাই ছেলেডারে তাদের হাতে তুইলা দিছিলাম। চোখের পানি ফেলা ছাড়া এখন আমার আর কিছুই করার নাই।’

নাজমুলের বড় ভাই সম্রাট মিয়া বলেন, ‘আমার মা ছেলের খবর শুইনা অসুস্থ হইয়া পড়েছেন। বাবা দিগ্‌বিদিক শূন্য হইয়া গেছেন। আমি এ চক্রের বিচার চাই। ওই চক্রকে ধ্বংস করা না গেলে আরও কত মায়ের কোল খালি হবে, তা ভেবে শঙ্কিত হই। এ চক্রকে ধরে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাই, যাতে আর কেউ জীবন নিয়ে পাশা খেলতে না পারে।’

এ ঘটনায় ফয়সালের বাবা ফারুক মাতুব্বর বাদী হয়ে নগরকান্দা থানায় গত ৫ ফেব্রুয়ারি ১০ জনকে আসামি করে মানব পাচার আইনে একটি মামলা করেন। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা নগরকান্দা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) পীযূষ কান্তি দে বলেন, পুলিশ মামলার এজাহারভুক্ত আসামি হান্নান মাতুব্বর ও তাঁর ছেলে তুহিন মাতুব্বর এবং সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে কাজল মাতুব্বরকে গ্রেপ্তার করেছে। তিনি বলেন, এ ঘটনায় বেঁচে ফেরা সামিউল সোমবার আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন।

এই পোস্টটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর