বুধবার, ২৫ মে ২০২২, ০৫:৪৯ পূর্বাহ্ন

সাত বছর ধরে শিকলে বাঁধা বাবা-মেয়ে

পদ্মা ডেস্ক
  • আপডেটের সময় : শনিবার, ১৯ মার্চ, ২০২২

সাত বছর ধরে গাইবান্ধার উত্তর আনালেরতাড়ি গ্রামে মানসিক প্রতিবন্ধী বাবা ও তার যুবতী মেয়েকে লোহার শিকলে বেঁধে রেখেছেন গ্রামবাসী ও পরিবারের লোকজন।

টাকার অভাবে চিকিৎসা করাতে পারছেন না পরিবার। সরকারি-বেসরকারিভাবেও তাদের চিকিৎসা সাহায্যে এগিয়ে আসেননি কেউ। এমনকি তাদের ভাগ্যে জোটেনি প্রতিবন্ধী ভাতাও। পরিবার ও গ্রামবাসীর দাবি-একটু চিকিৎসা পেলে তারা ফিরে পেতে পারে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবন।

গাইবান্ধার উত্তর আনালেরতাড়ি গ্রামে গেলে দেখা যায়, চার দেয়ালে আবদ্ধ কক্ষে নয়; উন্মুক্ত খোলা প্রান্তরে ভেঙে পড়া একটি টিনের চালার দুপাশে দুটি গাছে তালায় শিকল লাগিয়ে তাদের বেঁধে রাখা হয়েছে। বাড়ির লোকজন জানালেন, ছেড়ে দিলেই বাবা একদিকে ভাঙচুর শুরু করে আর মেয়ে দেয় ভোঁ দৌড়। আর কে পায় তাদের।

গ্রামবাসী রাজা মিয়া জানান, বাবা মোহাম্মদ আলী ও মেয়ে রেহানা আখতার টুলিকে লম্বা লোহার শিকল পায়ে বেঁধে গাছের সঙ্গে তালা আটকে রাখা হয়েছে। তবু তাদের মুখে হাসি লেগে থাকে।

বললেন-মোহাম্মদ আলী ভালোই ছিলেন। দিনমজুরী করে সংসার ভালোই চলছিলো। ভাতের জমি না থাকলেও বাড়ি ভিটা আছে নিজের। দুটি ঘরে তিন সন্তান ও স্ত্রী হালিমা খাতুনকে নিয়ে তাদের ৫ জনের সংসার। মেয়ে রেহানা আকতারের প্রাইমারি পর্যন্ত পড়ালেখা। তার বর্তমান বয়স ২১ এর বেশি নয়। তার বয়স যখন ১২ বছর তখন হঠাৎ করেই তার মানসিক সমস্যা দেখা দেয়। আবোল-তাবোল কথা বলে এবং বাড়ি থেকে বের হয়ে যেদিক খুশি চলে যায়। পরিবারের লোকজন ও স্বজনরা তাকে অনেক দিন খুঁজে গাইবান্ধা রেল স্টেশন থেকে ধরে নিয়ে আসে। কিন্তু সুযোগ পেলে বারবারই তিনি ইচ্ছেমতো যেথা খুশি চলে যান।

প্রতিবেশী মকবুল হোসেন জানান, একজন যুবতী মেয়ের এভাবে বাইরে ঘুরে বেড়ানো বিপজ্জনক। তাই বাধ্য হয়েই তার পায়ে লোহার শিকল পরিয়ে গাছের সাথে বেঁধে রাখা হয়। প্রথম দিকে মানসিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে গ্রাম্য ঝাড়ফুঁক ও কবিরাজি চিকিৎসা করা হয়। কিন্তু তাতে তার অবস্থার আরও অবনতি হতে থাকে । তার শরীর শুকিয়ে যায় ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে দগদগে ঘা দেখা দেয়। মেয়ের এই অবস্থার মধ্যে হঠাৎ করে ২০০২ সালের শুরুতে বাবা মোহাম্মদ আলীর মানসিক পরিবর্তন হতে থাকে। অস্বাভাবিক আচরণ শুরু করেন। লাঠি হাতে রাস্তা ঘাটে মানুষ দেখলেই মারতে তেড়ে আসেন। এ অবস্থায় স্ত্রী হালিমা খাতুনসহ তার পরিবারের লোকজন মেয়ে ও বাবাকে নিয়ে বিপাকে পড়েন। তাই বাধ্য হয়ে গ্রামবাসীর সহযোগিতায় বাবা-মেয়েকে পায়ে শিকল লাগিয়ে গাছের সাথে বেঁধে রাখা হয়।

স্থানীয় ইউপি মেম্বর মোস্তাক আহম্মেদ বলেন, প্রতিবেশীর পরামর্শে মোহাম্মদ আলীর স্ত্রী বাড়ি ভিটার একাংশ বিক্রি করে মেয়ে ও তার স্বামীকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী নানা চিকিৎসা করিয়েছেন। কিন্তু কুলিয়ে উঠছেন না তারা। তাদের চিকিৎসার জন্য অনেক টাকার প্রয়োজন।

সংশ্লিষ্ট খোলাহাটি ইউপি চেয়ারম্যান মাসুম হক্কানী বলেন, ইউনিয়ন পরিষদ থেকে তাদের দুজনকে সহযোগিতা করা হয়েছে। আগামী দিনেও তাদের সহযোগিতা করার চিন্তা ভাবনা রয়েছে।

এলাকার নাট্য ব্যক্তিত্ব জুলফিকার চঞ্চল বলেন, দীর্ঘদিন বেঁধে রাখার ফলে বাবা মেয়ের হাতে-পায়ে ও শরীরে ঘা’সহ নানা রোগ দেখা দিয়েছে। যদিও নিরুপায় হয়েই তাদের শিকলে বেঁধে রাখা হয়েছে। এ ছাড়া মানসিক প্রতিবন্ধী বাবা-মেয়ের চিকিৎসার খরচ যোগাতে সামান্য ভিটেমাটি যা ছিলো বিক্রি করে এখন পরিবারটি নিঃস্ব। মাত্র দেড় শতক জায়গায় একটি ঘরে হালিমার সংসার। অন্যের বাড়িতে কাজ করে যা জোটে তাই দিয়ে প্রতিবন্ধী দুজনসহ নিজেরা আধাপেট খেয়ে কষ্টে দিন কাটে। গ্রামবাসীরা পরিবারটিকে যে যা পারে সাহায্য করে। কিন্তু তারা এই অমানবিক দৃশ্য দেখতে চায় না। তারা চায় দুজনের সুস্থতা। এজন্য সরকারি সহযোগিতার দাবি জানান গ্রামবাসী।

গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক অলিউর রহমান জানান, তিনি ঘটনাটি শুনেছেন। এ ব্যাপারে তিনি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবেন বলে আশ্বাস দেন।

এই পোস্টটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর